বেশ কিছুকাল আগের একটা বাস্তব ঘটনার ছবি বা ফটোগ্রাফির কথা মনে পড়ছে। খুব মর্মস্পর্শী একটা ছবি, যেটা বুকের কোনো একটা খালি জায়গায় হুহু করে আঘাত করে যায়। উথালপাথাল মনটাকে আবেগে আপ্লুত করে। ছবিটার নাম ছিল ÔThe vulture & the little girl’।
এই ছবিটিতে একটা বুভুক্ষু শকুনক্ষুধায় যন্ত্রণায় দম ফুরিয়ে আসা মৃতপ্রায় ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ের মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল। ১৯৯৩ সালের মার্চে যখন সুদানে দুর্ভিক্ষ চলছিল তখন দক্ষিণ আফ্রিকার আইদ নামের এক গ্রামে চিত্রসাংবাদিক কেভিন কার্টার খুব দামি ক্যামেরায় একটার পর একটা ফ্ল্যাশ দিয়ে এই দুর্লভ মুহূর্তের ছবিটি তুলেছিলেন। দারিদ্র্য-অনাহারও তাদের দ্বারা প্রভাবিত মানুষ ছিল তার ছবির মূল বিষয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে সুদানের সে গ্রামে তখন খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছিল। অনাহারে ভেঙে পড়া মানুষ তাদের কঙ্কালসার দেহ নিয়ে পিঁপড়ার মতো ছুটছিল রিলিফ ক্যাম্পের দিকে। মানুষ যখন লাইন ধরে খাবার নিচ্ছিল, তখন বিপন্ন মানুষের ছবি তোলায় তিনি ব্যস্ত ছিলেন। চোখটা সেদিক থেকে তার হঠাত্ সরে গিয়ে পড়ল উপুড় হয়ে থাকা একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে। দেহের হাড়গুলো তার বেরিয়ে পড়েছে, কৃষ্ণবর্ণের শরীর মরুভূমির তপ্ত মাটিতে আরো কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। শরীরটা ক্ষুধায় ভেঙে পড়েছে তার। মরণাপন্ন মেয়েটি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে রিলিফ ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও সে বোঝে না মৃত্যু কী? তার পরও মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগোনোর চেষ্টা করতে থাকে...পারে না। ক্লান্তিতে জড়িয়ে আসে দুর্বল শরীর। থমকে যায়, উপুড় হয়ে পড়ে থাকে মাটিতে। আবার আচমকা কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একটা শকুন উড়তে উড়তে এসে মেয়েটির পেছনে অবস্থান নেয়। শকুন বুঝতে পারে, যে কোনো সময়ে ছোট্ট মেয়েটা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে এক কদম আগায়, শকুনটাও তার শিকারের দিকে এক কদম এগিয়ে যায়। ক্ষুধার্ত শকুন সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কখন ‘ছোঁ’ মেরে তার মতো আরেকটি ক্ষুধার্ত প্রাণকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তার দেহটা খাবলে খাবে। এইভাবে মানুষ আর শকুনের চলতে থাকা রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের ২০ মিনিট পর বিখ্যাত এই ছবিটি তোলেন কেভিন কার্টার। বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পৃথিবীতে সাড়া জাগানো ছবিটিকে কেভিন কার্টারের কাছ থেকে খুব চড়া দামে কিনে নেয় ও ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ তাদের সংবাদপত্রে এটি গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪ সালে এই বিস্ময়কর ছবির জন্য পুলিত্জার পুরস্কার অর্জন করেন কেভিন কার্টার। হঠাত্ করেই তার জীবন পালটে দেয় এই একটা ছবি। খ্যাতি, যশ, সম্মান, প্রশংসায় ভাসতে থাকেন তিনি। কিন্তু কার্টার এত বড় সম্মান পাওয়ার পরও মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু আত্মহত্যার কারণ কী ছিল?
আসলে তিনি যখন সে সময় এত বড় পাওয়া সম্মান উদ্যাপনের আনন্দে ব্যস্ত ছিলেন, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্র তার পুরস্কার প্রাপ্তি ও প্রশংসার জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল, মানুষ তাকে দেখলেই যখন বিস্মিত হয়ে ঘিরে ফেলত, সে সময় ফোন ইন্টারভিউয়ে একজন জিজ্ঞাসা করেন, শেষ পর্যন্ত মেয়েটির কী হয়েছিল? কার্টার উত্তর দেন, সেটা তিনি জানেন না, কারণ তার ফ্লাইট ধরার তাড়া ছিল।
ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি তখন বলেন, ‘আমি বলছি, সেদিন ওখানে দুটো শকুন ছিল, তার মধ্যে একজনের হাতে ক্যামেরা ছিল।’ তার বন্ধুও পরিচিতজনেরা তাকে বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন। ছবি তুলেছ সেটা অপরাধ নয়, তবে শিশুটিকে না বাঁচিয়ে শকুনের হাতে তুলে দিয়ে আসাটা ছিল অপরাধ। ইচ্ছে করলেই তো তুমি শিশুটিকে বাঁচাতে পারতে। কেভিনের অবচেতন মন বুঝতে পারল, সে-ও সে সময় শকুন হয়ে উঠেছিল। তার সৃষ্টির ক্ষুধা মেটানোর লোভ দিয়ে পৃথিবীকে জয় করার নেশা আর ছোট মেয়েটিকে গ্রাস করে ক্ষুধা মেটানোর লোভে বসে থাকা শকুনটার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। কেভিন বুঝতে পারেন, আলোর নিচেই অন্ধকার থাকে। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মধ্যে জ্বলে উঠবার ক্ষমতা থাকে। সমুদ্রের নীরবতার মধ্যে ধ্বংস করার শক্তি থাকে। ঠিক তেমনি মানুষের কাছে আপাতদৃষ্টিতে যা ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে, তার পেছনেও নেতিবাচক দিক থাকতে পারে। যা আমরা দেখি তার সবটা দেখি না। এই না-দেখাটা কখনো মানুষের অপূর্ণতা, কখনো বিবেচনাবোধের অভাব, কখনো স্বপ্রণোদিত বাসনা। সৃষ্টির মধ্যে আনন্দ, মৌলিকত্ব, চিন্তাশীলতার উদ্ভাবন থাকলেই চলবে না, সৃষ্টির মধ্যে মানবিক মূল্যবোধও থাকতে হবে। কেভিনের ছবিটার মধ্যে সব ছিল, শুধু ছিল না মানবিকতা। এই মানবিকতাকে সে সময় কেভিন দেখতে পাননি বলে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছেন। কেটেছে নিদ্রাহীন রাতের পর রাত। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে মাটিতে, ছবি তোলা ছেড়ে দিয়েছেন। তার পরও নিজের অন্তর্জ্বালার সঙ্গে লড়াইয়ে করে জিততে পারেননি। পাইপ দিয়ে কার্বন মনোক্সাইড টেনে টেনে ক্ষতবিক্ষত করেছেন ঝিলির মতো নরম ফুসফুস। এভাবে সে সময়ের অদেখাও চিন্তায় রেখাপাত না করা একটা ভুলের মাসুল দিতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এটা এমন এক অদৃশ্য পাপের অনুশোচনা ছিল, যা সে সময় তিনি বুঝতে পারেননি। কিছু কিছু পাপ কখনো কখনো মানুষের চোখের অগোচরে ঘটে যায়, যা মানুষ জানতে পারে না। হয়তো মানুষটা ভাবছে, সে পুণ্যের কাজ করছে কিন্তু দৃশ্যমান পুণ্যের ভেতরে অদৃশ্যমান পাপ কখন যে তাকে গ্রাস করেছে, সেটা বোধ হয় সময়ে বোঝা যায় না। অসময়ে বোঝা যায়। কেভিন অদৃশ্য একটা পাপবোধ থেকে শুকুন হয়েছিলেন। তবে এখন চারপাশে শকুন আর শকুন। শকুনের ভেতর শকুন। শকুনের ওপর শকুন। শকুনের চার পাশে শকুন। তাদের পাপ আর অপরাধটাকে কেভিনের মতো অদেখা নয়, বরং খুব দৃশ্যমান। অথচ তাদের মধ্যে অনুশোচনার চিহ্ন নেই। অনুশোচনা নেই বলে আত্মোপলব্ধি নেই। বিবেকের তাড়না নেই। নিজের ভেতরে ঢুকে নিজের প্রকৃত সত্তাকে বের করে আনার শক্তি নেই। পাপ ও অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া পাপ আর রাষ্ট্র অথবা সমাজের অবাধ্য হওয়া অপরাধ। সেটা যা-ই হোক, যে নামের হোক, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য সুতোর টান যেটা মানুষকে মানুষ হতে দিচ্ছে না। হয়তো মানুষের মনুষত্ব মরে গিয়ে প্রাণহীন জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে মানুষ বের হতে পারবে কি না, কে জানে। একটার পর একটা মানুষের ভেতর শকুন প্রবেশ করে মানুষকে শকুনে পরিণত করছে। ঠিক এর উলটোটা কখনো ঘটছে না।
সত্যজিত্ রায়ের চলচ্চিত্র অপুর সংসারে সদ্য বিবাহিত বউ-বরের কিছু সংলাপে অনুশোচনা কেমন করে যেন ইতিবাচক শক্তিতে বদলে গেছে। দুজনের সংলাপগুলো ছিল এমন : ‘—অপর্ণা। —হুম। —তোমার অনুশোচনা হয় না? —কী হয় না? —অনুশোচনা। —অত শক্ত কথা বুঝি না। —আপসোস বোঝো? আপসোস। —বুঝি। —আপসোস হয় না? —কীসের আপসোস? —সেটাও বুঝিয়ে দিতে হবে? —হ্যাঁ হবে। —বড়লোক বর ফসকে গেল। তাই আপসোস। হাসছো? —না হাসছি না। কাঁদছি। —তোমার নিশ্চয় আপসোস হয়। তুমি আমাকে বলো না। —তা হয় বইকি। কেমন পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে বসে খেতে পারতাম। —চললুম। —কোথায়? —ঝিয়ের খোঁজ করতে। —এই শোনো, কী ছেলেমানুষি করছো? উঠে এসো —সরো। ঝিয়ের মাইনে দেবে কে? —আর একটা টিউশনি নেবে। —তাহলে আমাকে বাপেরবাড়ি পাঠিয়ে দিও। —কেন? —এমনিতেই তো আপিস করে ছেলে পড়িয়ে সেই রাত্তির করে বাড়ি ফেরো। তার ওপর আবার... —আর উপায় কী বলো? আমি বলব? যে টিউশনিটা আছে সেটাও ছেড়ে দাও। —তারপর? তারপর আমার গরিব বর সন্ধের আগেই বাড়ি ফিরে আসবে। আর আমার কোনো অনুশোচনা থাকবে না।’
জীবনের সরলতার কাছে অনুশোচনা থাকে না, আপনজনের প্রিয়মুখ দেখবার আকুলতা থাকে। আপনজনকে সারাক্ষণ মনের গভীরে ধরে রাখার ব্যাকুলতা থাকে। জীবনবোধের ছোট ছোট অনুভূতি, সুখ, আনন্দ, ভালোবাসা আর বিশ্বাসকে জয় করার মতো অমিত সুধা থাকে। যেখানে আপনজনের জন্য পরান কাঁদে, অনুশোচনা সহজ হয়ে আপসোস হয়, তারপর হাওয়াই মিঠাই হয়ে মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায়। এমন অনুশোচনা দৃশ্যমান থাকে। তবে সেটা দেখার মতো চোখ থাকতে হয়, মন থাকতে হয়। সব অনুশোচনা পাপ থেকে সৃষ্টি হয় না। জীবন চিনুক সেই পদ্যময় অনুশোচনাকে, গদ্যময় পাপের প্রায়শ্চিতকে নয়।
n লেখক :শিক্ষাবিদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
