নিরাপদ পৃথিবীর অনুষঙ্গ ভালো মানুষ। সব যুগে সব কালে ভালো মানুষ হওয়ার চর্চা পৃথিবীতে ছিল। আজও আছে। এই চর্চাটাই জ্ঞানচর্চা। যুগে যুগে স্রষ্টাপ্রেরিত দূতগণ পৃথিবীতে এসেছেন, গেছেন। বলা যায়, তাদের প্রবহমান চিন্তাধারায় স্বল্প পরিসরে হলেও এই চর্চাটা আবর্তিত থাকে সব সময়। পৌরাণিক একটি গল্পে বলা হয়েছে, কবিগণের হূদয়ভূমি স্রষ্টার অধিষ্ঠান। কতটা পরিশুদ্ধ হলে স্রষ্টার অধিষ্ঠান হতে পারে, তা অবশ্য ভাবনার বিষয়। পরিশুদ্ধ মনের জ্ঞানচর্চাকারী মনীষীদের হূদয়ভূমি স্রষ্টার অধিষ্ঠান, তাতে সন্দেহ নাই। কল্যাণময় বিমূর্ত চিন্তার কবি-লেখকগণও অনুরূপ জগত্-কল্যাণের প্রতিভূ। ওরা অন্তরে ধারণ করে সচ্চিন্তা। মানুষকে ‘মানুষ’ করার ব্রত ওরাই গ্রহণ করে। নীলাকাশের মতো আলোকোজ্জ্বল ওদের অন্তর। ওদের কল্যাণময় চিন্তাচেতনার দৃঢ়প্রত্যয় সকলকে আবিষ্ট করে। ওদের প্রণীত গ্রন্থরাজি জগত্-সংসারের আলো। মনের আকাশে প্রজ্বলিত শুকতারা। এই অমিয় চিন্তাধারার প্রবহমান স্রোতস্বিনীর স্বচ্ছ জলে স্নাত হওয়াটা জরুরি, যা অবশ্যম্ভাবী কর্তব্যকর্ম। সবার জন্য প্রযোজ্য।
সমাজ-জীবনে পরিবারগুলোই শুভ-অশুভ চিন্তাধারা ধারণ করে থাকে। যে সমাজে শুভ চিন্তার ধারক বা চর্চা বেশি, সে সমাজ মানবিকতায় উজ্জ্বল। বোধ করি এ কারণে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট তার সময়ে একদিন বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে সুসভ্য-শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ সুসভ্য সমাজ-জীবনই সুসভ্য দেশ। পরিবার হলো জ্ঞানচর্চার প্রথম ধাপ। একেকটি মা মানে একেকটি পরিবার। এই মায়ের ওপরই বর্তায় সন্তানের লালনপালন, ভালো-মন্দ মানসগঠনের নানাদিক। মায়ের ভূমিকাই প্রধান। নেপোলিয়ানের মনোজাগতিক উন্নয়নের উপলব্ধি আমরা হূদয়ে ধারণ করতে পারি। এজন্য স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মানুষ তৈরি খুবই জরুরি। এভাবেই কল্যাণময় বিমূর্ত প্রবহমান চিন্তার মাধ্যমে সমাজজীবনের পরতে পরতে কল্যাণপ্রসূ সত্মানুষ তৈরি হতে পারে। এখানে সৃজনশীল বইয়ের সঙ্গে সহাবস্থান মুখ্য বিষয়। রাষ্ট্র হবে উপযুক্ত অভিভাবক। শাসনের নীতিমালা নিয়ে রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে। রবি ঠাকুরের ‘আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’—এই নীতিকে অনিবার্য সত্য বলে গ্রহণ করতে হবে।
এখানে প্রশ্ন, কীভাবে আমরা সুস্থ সুন্দর সমাজ-জীবন পাব? কীভাবে সুস্থ মনোজগত্ তৈরি হবে আমাদের? কোন সে পথ? যে পথে হাঁটলে সুস্থ সুন্দর মন তৈরি হয়; মনুষ্যত্ব ও মমত্বের ছোঁয়া পাওয়া যায়। সে পথের সন্ধান লাভ আমাদের জন্য জরুরি। তথাকথিত বড়লোকের পথ তো শোষণ-বঞ্চনার পথ; অর্থকড়ির পথ। যে পথে মনোজগতের উন্নতি নেই। যে পথে দেখা মিলে অর্থকড়ির উল্লম্ফন আর আত্ম-অহংকারের উল্লাস। স্বার্থান্ধ উন্নয়নের পথের পাশে হাতপাতা নিরন্ন মানুষের সংখ্যা তো কম নয়। এ রকম সমাজে তো হত্যা-ধর্ষণের মতো বিতিকিচ্ছি কাণ্ডগুলো সমানে ঘটতেই থাকে। অনৈতিক অনাচারে দেশ ভরে ওঠে।
জ্ঞানচর্চার পথই অনিবার্য সত্য পথ। এই চর্চা হবে সুনির্বাচিত সৃজনশীল বইপড়াসহ এবং সুন্দর সংস্কৃতিচর্চার বলয় তৈরির মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী বয়সি সন্তানদের জন্য। সুশিক্ষাচর্চার আবহে গড়তে হবে প্রতিটি পরিবার, যা হবে পাঠ্য-তালিকাবহির্ভূত। মৃিশল্পীদের ঘষেমেজে হাঁড়িপাতিল তৈরির মতো। ছয় থেকে ২২ বছর বয়সিদের এই চর্চার আওতায় ধরে রাখা বাঞ্ছনীয়। দেশ জুড়ে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যাপীঠগুলো হবে এই চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সরকারপ্রদত্ত সুনির্বাচিত সৃজনশীল বই এখান থেকেই শিক্ষার্থীরা হাতে পাবে। পড়ার ব্যাপারটি দেখভালের কাজ হবে শিক্ষকের। জীবনভর সত্ ও সুস্থ মনোজগতের উন্নয়নের এটাই পথ। এই বিশাল কাজটা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রই পারে এটা করতে। কীভাবে করবে সে চিন্তাও রাষ্ট্রের। যে চিন্তা নেপোলিয়নের মাথায় এসেছিল। শিক্ষিত মা মানে, শিক্ষিত পরিবার; শিক্ষিত পরিবার মানে, সুসভ্য জাতি, সুসভ্য দেশ। রাষ্ট্রের সত্ অভিভাবকত্বের চিন্তার মধ্যে এর সাফল্য নিহিত। কলকাতার এক লেখক পথে এক কিশোরকে বিড়ি ফুঁকতে দেখে তার বাবা-মার কাছে গিয়েছিলেন কৈফিয়ত চাইতে। কেন কিশোর বয়সি এই সন্তান বিড়ি ফুঁকবে? একেই বলে সত্-অভিভাবকত্ব, একেই বলে সুস্থ মনোজগতের কল্যাণময় বিমূর্ত চিন্তা।
রাষ্ট্রযন্ত্রের তো আবেগানুভূতি থাকে না। যারা এই যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, তাদের মনোজগতের আবেগানুভূতিই গড়ে তুলতে পারে সুস্থ সমাজ-জীবন।
n লেখক : সাংবাদিক
