জনসচেতনতার বিকল্প নেই

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৯

গত চার বছর থেকে  যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বসিয়ে ঢাকার বাতাসে দূষণ ও বিপদের মাত্রা, সেইসঙ্গে তাত্ক্ষণিক করণীয়ও জানান দিয়ে আসছে। ইন্টারনেটে এটি রিয়াল টাইম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) যেটাকে বাংলায় ‘সার্বক্ষণিক বায়ুমান সূচক’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। বিশ্বে নির্ভরযোগ্য এ যন্ত্রের সূচকে দেখা যায়  ঢাকার বাতাসে দূষণ বা বিষের অবস্থা মারাত্মক। চব্বিশ ঘন্টায়ও ইতিবাচক সবুজ সূচকে আসছে না। এমনকি  বিপজ্জনক সূচক (কারো কারো জন্য অস্বাস্থ্যকর হলে) কমলাতেও থাকছে না। বেশিরভাগ সময় বায়ুতে অতি বিপজ্জনক উপাদানের উপস্থিতি দেখাচ্ছে। এ নির্ভরযোগ্য যন্ত্রের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় দশ হাজার শহরের বায়ুমান পরীক্ষা করা হয় বলে বিভিন্ন পত্রিকাসূত্রে জানা যায়। বায়ুমান থেকে জানা যায় বায়ুতে থাকা  কয়েকটি রঙ ও বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর বস্তুকণার (যেমন ওজোন গ্যাস, হাইড্রোজেন সালফাইড, সিসা, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড) উপস্থিতির পরিমাণ। ভাবার বিষয় হচ্ছে- দুপুরের পর থেকেই ঢাকার বাতাসে বিপজ্জনক উপাদানের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এমনকি ছুটির দিনেও সবুজ সংকেতে আসছে না।

বাতাসে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র এসব বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ঢাকার বাতাসে পাওয়া গেছে এর চেয়ে বেশিমাত্রায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা গতবছরের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতিও। ঢাকা শহরের ছয়টি বিদ্যালয়ের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা নিয়ে ২০১৬ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরবান ল্যাব। ফলাফলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না। তাদের ফুসফুস ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ করছে।

স্বাস্থ্যবিদদের অভিমত হচ্ছে-বায়ুতে থাকা সিসা মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর একটা বিষয়। সিসার উপস্থিতির প্রভাবে মানুষ দ্রুত বুড়িয়ে যায়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে শিশুরা দুর্বল বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এ ছাড়া বায়ুতে থাকা ক্ষতিকর বস্তুকণা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুস শক্ত হয়ে অক্সিজেন প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে ক্যান্সারসহ নানা রোগ জন্ম নেয়। বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূক্ষ্ম এ বস্তুকণা স্বল্প মেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী বলে জানান চিকিত্সকরা। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউ বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ঢাকার বায়ু দূষণের জন্য ইটভাটা, সড়কের ধুলা, যানবাহন এবং বায়োগ্যাস পোড়ানোকে দায়ী করে তারা। ঢাকার বায়ু দূষণে ইটভাটা ৫৮ শতাংশ, সড়কের ধুলা ১৮ শতাংশ, যানবাহনের ধোঁয়া ১০ শতাংশ, বায়োগ্যাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণ ৬ শতাংশ দায়ী বলে জানানো হয়। ঢাকা মহানগরীর আশেপাশে অনেক এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার কারণে বাতাসে সূক্ষ্ন নানা ধরনের ধূলিকণা মিশে যায়। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে।

ইট প্রস্তুতের ধরন ও আগে-পরের বিষয়/পদ্ধতি নিয়ে পূর্বের ইট প্রস্তুত আইন ২০১৩ সংশোধন করা হয়েছে। ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক পদ্ধতিকে যাতে প্রমোট করা হয়, আইনের বিভিন্ন ধারায় তা সংযোজন করা হয়েছে। মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরির বিকল্প হিসেবে অপোড়ানো পদ্ধতি ব্লকের দিকে যেতে হবে। এজন্য আইনটি ব্যাপকভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।  কিন্তু বড় চিন্তার জায়গা হলো নির্মাণকাজ। যে যেভাবে পারছে নির্মাণকাজ করছে। এজন্য যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা  তৈরি করতে হবে। যত্রতত্র ও ‘যে যেভাবে পারে’ নির্মাণ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য প্রশাসনকে বা কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র মুনাফার কথা না ভেবে মালিক/সমিতি/ডেভেলপারদেরকে দেশ ও ভবিষ্যতের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। তাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে।

বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যায়, বেশ কিছু উন্নত দেশ (এমনকি ভারতেও) বায়ু বিপজ্জনক বা অস্বাস্থ্যকর হলেই স্কুল-কলেজ ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। অনেক দেশের বায়ুমান বিপজ্জনক, এমনকি অস্বাস্থ্যকর দেখালেই ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। শহরের উন্নয়ন কাজ সমপন্ন করার ক্ষেত্রেও মানা হয় পরিবেশ সমপর্কিত সব আইন-কানুন। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম চিন্তা-ভাবনা নেই বা থাকলেও তা খুব কম। এমনকি বায়ু দূষণে অতিবিপজ্জনক অবস্থায় থাকা খোদ রাজধানীর বাসিন্দাদেরও খুব কমই উদ্যোগ/কর্মসূচি রয়েছে। আশা করি, নতুন সরকার এই ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

জনসচেতনতাই আমাদের বিভিন্ন দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। যারা দূষণকারী তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইন প্রণয়নও দরকার।  এছাড়া নগরায়ণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দরকার সবুজ বিপ্লব। দরকার বনায়ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারখানা স্থাপন। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের আবাসস্থল  আমাদের প্রিয় রাজধানী শহরকে বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের সবার।

n লেখক : প্রাবন্ধিক