পৃথিমপাশার নবাববাড়ি হতে পারে পর্যটনকেন্দ্র

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ২২:২৬

শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে এখনো টিকে আছে কুলাউড়ার পৃথিমপাশা জমিদারবাড়ি (নবাববাড়ি)। মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে ঐতিহাসিক এই জমিদারবাড়ির অবস্থান। জমিদারবাড়ির নয়নাভিরাম পাথরের আসবাবপত্র, মসজিদের গায়ে খচিত দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম, ইমামবাড়া, সুবিশাল দীঘি যে কোনো সৌন্দর্যপিপাসুর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

প্রায় ৩৫ একর ভূমির ওপর অবস্থিত জমিদারবাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ইমামবাড়া। জমিদাররা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ায় প্রতি বছরই এখানে যথাযোগ্য মর্যাদায় আশুরা পালন করা হয়। জমিদারদের বর্তমান বংশধররাও মহরম উপলক্ষ্যে তাজিয়া মিছিল বের করে। এই সময়ে জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে ১০ দিনব্যাপী মেলা বসে।

মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে ইরান থেকে ধর্মপ্রচারের জন্য ভারতবর্ষে আসেন সাকি সালামত খান। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশেই তার ছেলে ইসমাইল খান পৃথিমপাশায় আসেন। তার নামানুসারে পৃথিমপাশার জমিদারবাড়ির দীঘির নাম রাখা হয় ইসমাইল খানের দীঘি। ইসমাইল খানের ছেলের নাম শামসুদ্দিন খান। শামসুদ্দিন খানের ছেলের নাম রবি খান। যার নামানুসারে এই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে রবিরবাজার হাট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এক সময় এলাকাটি ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এখানকার শ্বাপদসংকুল বন ঘেরা পাহাড়ি জনপদে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী উপজাতিদের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল। শ্রীহট্ট (সিলেট) সদরে সেই সময় রবি খাঁর ছেলে মোহাম্মদ আলী আহমদ খান নামে একজন কাজি (বিচারক) ছিলেন। ১৭৯২ সালে নওগাঁ কুকিদের বিদ্রোহ দমনে মোহাম্মদ আলী আহমদ খান বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে তত্কালীন ইংরেজ শাসকদের সাহায্য করেন। ইংরেজ সরকার এতে খুশি হয়ে মোহাম্মদ আলীর পুত্র গউছ আলী খানকে ১ হাজার ২০০ হাল বা ১৪ হাজার ৪০০ বিঘা নিস্কর জমি দান করেন। তত্কালীন বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন গউছ আলী খাঁর পৌত্র নবাব আলী আমজদ খান। তিনি সমাজসেবক, দানশীল ও পরোপকারী জমিদার হিসাবে সমগ্র বাংলা এবং আসামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সিলেটের বিখ্যাত আলী আমজদের ঘড়ি ও সুরমা নদীর তীরে চাঁদনিঘাটের সিঁড়ি তার কীর্তি। তার সময় এই জমিদারবাড়িতে ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুরসহ বহু ইংরেজ ভ্রমণ করেন গেছেন। ১৯৫১ সালে ইরানের রাজা রেজা শাহ পাহলভী পৃথিমপাশা জমিদারবাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। তার আগমন উপলক্ষ্যে লংলা রেল স্টেশনে একটি বিরাটকায় পাকা গেট নির্মাণ করা হয়। এই গেটটি এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে আলী আমজদ খান মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ায় বিভিন্ন স্কুল এবং সুপেয় পানির জন্য অনেক দীঘি খনন করেছিলেন।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগে, তবে রয়ে গেছে সুবিশাল বাড়ি এবং তার পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য ও আভিজাত্য। দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখনো এখানে আসেন এই জমিদারবাড়িটি দেখার জন্য। জমিদারের বর্তমান উত্তরসূরি সাবেক সংসদ সদস্য আলী আব্বাস খান বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাড়িটি ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল কিন্তু এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে তা সম্ভব হয়নি। পরিবারের অনেক সদস্য প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন, আমরা যারা এখানে আছি তাদের এলাকাবাসী ভালোবাসে এবং আগের মতো শ্রদ্ধা করে। স্থানীয় ওয়াকফ স্টেটের অন্তর্গত এই বাড়ি হতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।