ভেনামি চিংড়ি চাষে সাফল্যের হাতছানি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ২২:২৬

 ‘ভেনামি’, চিংড়ির নতুন এক প্রজাতি। উচ্চ ফলনশীল, সস্তা ও সহজলভ্য এই চিংড়ি খেতেও বেশ সুস্বাদু। এর উত্পাদন খরচও যথেষ্ট কম। জন্ম ভিয়েতনামে হলেও ভেনামির বিচরণ এখন এশিয়ার ১৫টি দেশে। বিশ্বের পুরো চিংড়ির বাজারও এখন ভেনামির দখলে। তবে একমাত্র বাংলাদেশ বাদে বাকি ১৪টি দেশেই এর উত্পাদন হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। কিন্তু বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে কেবল পরীক্ষামূলক উত্পাদনে সময় পার করে। বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি উত্পাদন হলে সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছেন চিংড়ি রপ্তানিকারকরা।

চিংড়ি চাষি ও রপ্তানিকারকরা বলছেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম খাত চিংড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র ভেনামিই পারে বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের সম্প্রসারণ করে বিশ্ব বাজার ধরে রাখতে। অন্যথায় ধারাবাহিক অবনতিতে ‘খাদের কিনারায়’ এসে দাঁড়ানো চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে দ্রুত একটি সহজ নীতিমালার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষকে উন্মুক্ত করে রপ্তানির পদক্ষেপ নিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

এদিকে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে বাগদা চিংড়ির গড় উত্পাদন হেক্টর প্রতি ৩৪১ কেজি। সেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘ভেনামি’ চিংড়ির হেক্টর প্রতি গড় উত্পাদন ৭ হাজার ১০২ কেজি। অর্থাত্ বাগদার তুলনায় ‘ভেনামি’র উত্পাদন হেক্টর প্রতি ৬ হাজার ৭৬১ কেজি বেশি। যার প্রমাণ মিলেছে খুলনায় প্রথম বারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে চাষকৃত ‘ভেনামি’র উত্পাদনে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে উত্পাদন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও দেশে ‘ভেনামি’ চাষে যথেষ্ট সাফল্যের সম্ভাবনা আছে বলেই মনে করছে চিংড়ি রপ্তানিকারকদের বৃহত্ এই প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, খুলনার পাইকগাছা লোনা পানিকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কেন্দ্রপ্রধান ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, ভেনামি চিংড়ি চাষের জন্য সরকারের নির্দেশে লোনা পানিকেন্দ্রের ছয়টি পুকুর উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়। ২০২০ সালে এই কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ প্রথম চিংড়ি ছাড়া হয়। তবে তারা দুটি পুকুর রিজার্ভ রেখে বাকি চারটিতে চিংড়ি চাষ করে। ৭ লাখ ৭২ হাজার ৮০০টি পোনা আসে থাইল্যান্ড থেকে। প্রথম পুকুরে উত্পাদন কিছুটা কম হলেও দ্বিতীয় পুকুরে ভালো হয়েছে। অন্য দুটি পুকুরের উত্পাদন আরও ভালো হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

চিংড়ি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মত্স্য কর্মকর্তা প্রফুল কুমার সরকার জানান, প্রতি সপ্তাহে চিংড়ির বৃদ্ধি এবং রোগ বালাই অনুসন্ধানে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। চলতি বছর তাপমাত্রা বেশি থাকায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই চিংড়ির রোগপ্রতিরোধ এবং জীবন ধারণক্ষমতা বাগদা চিংড়ির তুলনায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, পোনা ছাড়ার পর সাত সপ্তাহ পর্যন্ত রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকলেও এ প্রকল্পে তেমনটা দেখা যায়নি।

খুলনা ফিশ ইন্সপেকশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টর মজিনুর রহমান বলেন, ‘ভেনামি চিংড়ির গ্রোথ ও ফার্টিলিটি রেট খুবই আশাব্যঞ্জক। নতুন জাতের এই চিংড়ির উত্পাদন সময়কাল ১২০ দিন। যার মধ্যে প্রথম ৬০ দিন যে পরিমাণ বৃদ্ধি হয় পরবর্তী ৬০ দিনে তার তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পায়।’ তিনি বলেন, সাধারণ পুকুরে প্রতি হেক্টরে ৩০০-৪০০ কেজি বাগদা উত্পাদন হয়। অন্যদিকে একই পরিমাণ জমিতে ৭ থেকে ৮ হাজার কেজি ভেনামি চিংড়ি উত্পাদন সম্ভব। পাশাপাশি গলদা ও বাগদা চিংড়ি বছরে একবার চাষ হয়, কিন্তু একই জমিতে ভেনামি চাষ করা যায় বছরে তিন বার।

বিএফএফইএ এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস হুমায়ুন কবীর বলেন, কাঁচামালের (চিংড়ি) অভাবে দেশের ১০৫টি হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৮টি কোনো রকমে চালু আছে। এ অবস্থায় রপ্তানির এ খাতটি ‘খাদের কিনারায়’ এসে দাঁড়িয়েছে। এ শিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ভেনামি চাষ করে চিংড়ির উত্পাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

ফ্রোজেন ফুডসের পরিচালক ও বাংলাদেশে নিবিড়-আধানিবিড় বাগদা চিংড়ি চাষের প্রবর্তক এম এ হাসান পান্না বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদার চাহিদা ক্রমাগত কমছে। ভেনামির উত্পাদন খরচ বাগদার থেকে কম এবং বড় হওয়ার সময়কালও কম। তবে ভেনামি চিংড়ি চাষ করতে হলে দেশেই এর এসপিএফ পোনা উত্পাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবেই প্রান্তিক চাষি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে এর বিস্তার লাভ করবে। সরকারের অনুমতি পেলে তিনি নিজেই বাণিজ্যিকভাবে ‘মডেল’ হিসেবে ভেনামির পোনা উত্পাদন ও চাষ সম্প্রসারণের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

দেশের প্রথম ভেনামি চিংড়ি চাষের উদ্যোক্তা যশোরের এমইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, ৩৩ বিলিয়ন ডলারের চিংড়ির বিশ্ববাজার। যার ৮০ ভাগই দখল করে নিয়েছে ভেনামি চিংড়ি। আমাদের লড়তে হয় মাত্র ২০ শতাংশ বাজারের জন্য। সেখানেও নানা প্রতিকূলতায় বাজারের দরপতনের কারণে চিংড়ির উত্পাদন ও রপ্তানিতে পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা। বিশ্ববাজারের চাহিদা বিবেচনায় দেশে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে ভেনামি চিংড়ি চাষের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।