গ্রামাঞ্চলে চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করার জন্য হাতের কাছেই গড়ে উঠেছে হাসপাতাল। উপজেলা থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত চিকিত্সার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু চিকিত্সক, টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য জনবলের অভাবে উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সাসেবার বেহাল দশা। কোনো কোনো উপজেলা হাসপাতালে বছরের পর বছর ধরে চিকিত্সক নেই। নেই টেকনিশিয়ান। যে কারণে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে, প্যাথলজি, আলট্রাসনোগ্রাম, মাইক্রোস্কোপসহ পরীক্ষানিরীক্ষার কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে আছে। কোনোটি আছে বাক্সবন্দি অবস্থায়। অনেক হাসপাতালের চারদিকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। জনবলসহ এসব ব্যবস্থাপনা যদি সচল থাকত করোনাসহ অন্যান্য রোগের চিকিত্সা স্ব স্ব উপজেলার জনগণ সেখান থেকেই পেতেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, করোনা উপসর্গভিত্তিক চিকিত্সা দিলে ৮০ থেকে ৯০ ভাগই সুস্থ হয়ে যান। এখন গ্রামে সংক্রমণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের উপসর্গের রোগীদের চিকিত্সাসেবা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, ইউনিয়নের সাব সেন্টার ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেই দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু চিকিত্সকসহ জনবলসংকটের কারণে এসব উপসর্গের রোগীরা প্রতিদিনই শহর ও রাজধানীতে ভিড় করছেন। অনেকে সিট বা আইসিইউ না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যাচ্ছে। প্রতিদিনই এই চিত্র বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক এগুলো তদারকিও করেন না। উপজেলা হাসপাতালের কর্মকর্তারা বিষয়গুলো সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানালেও বছরের পর বছর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিত্সক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনা উপসর্গে সাধারণত গ্রামের মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর ও গলাব্যথাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। তারা মনে করেন, এটা এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে তা নয়। কোনো উপসর্গ নিয়ে অবহেলা করা উচিত নয়। শুরুতে চিকিত্সা দিলে যে কোনো রোগেরই ৯০ ভাগ নিরাময় সম্ভব। তাই শুরুতে করোনার উপসর্গভিত্তিক চিকিত্সা উপজেলা হাসপাতাল থেকেই দেওয়া সম্ভব। আর উপজেলার চিকিত্সকরাও একই মত দিয়েছেন। চিকিত্সকসহ জনবলসংকটের কারণে আমাদের পক্ষে করোনাসহ বেশির ভাগ রোগের চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হয় না। রোগীরা এসেও ফিরে যায়। ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরা সরেজমিনে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবার এই বেহাল দশার চিত্র দেখতে পান।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যার হলেও জনবল ৫০ শয্যার। আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্সরে মেশিন বিকল হয়ে পড়ে আছে। তিনটি মাইক্রোস্কোপ পাঁচ বছর ধরে পড়ে আছে। ব্যবহার নাই। তিন বছর ধরে বন্ধ এক্সরে মেশিন। মেডিক্যাল অফিসারসহ কনসালট্যান্ট চিকিত্সকের সংকট। রোগীদের চিকিত্সা নির্ভর করে স্থানীয় ক্লিনিকের ওপর। দালালরা ভাগিয়ে রোগীদের ক্লিনিকে নিয়ে যায়।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, দুই যুগ ধরে এখানে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না। এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাম, রক্ত পরীক্ষা বন্ধ। চিকিত্সকসহ জনবলের সংকট রয়েছে। এখানে কোনো বিশেষজ্ঞ (কনসালট্যান্ট) চিকিত্সক নাই। ডেন্টাল, ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওগ্রাফার পদ শূন্য। ছয় বছর ধরে এক্সরে ও ডেন্টাল মেশিন বদ্ধ কক্ষে রাখা হয়েছে। ব্যবহার না করায় এসব যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান এক কর্মকর্তা।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, এখানে ১০০ বেডের হাসপাতাল চলে ৫০ বেডের জনবল দিয়ে। তাও অর্ধেক জনবল নাই। ১১ জন চিকিত্সকের পদ শূন্য। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১৪৮টি পদের মধ্যে ৩৭ পদই শূন্য। এক্সরে টেকনিশিয়ান ও আলট্রা স্পেশালিস্ট নেই। অপারেশন বন্ধ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন কুমার বসাক জানান, ৫০ শয্যার জনবল নিয়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। নামেই ১০০ শয্যার হাসপাতাল। আসলে চলছে ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে।
লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা করা হয়েছে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে। কিন্তু জনবল ৩১ বেডেরই রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে আটটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রেও চিকিত্সক না থাকায় সেবা বন্ধ। আট বছর ধরে প্যাথলজি বিভাগ, অপারেশন বন্ধ। অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করার ফলে এগুলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, জনবলসহ টেকনিশিয়ান না থাকায় এ অবস্থা হয়েছে।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, চিকিত্সকসহ অন্যান্য জনবলের অভাবে রোগীরা প্রতিদিনই ফিরে যান। ১২ জন চিকিত্সকের মধ্যে সাত জন আছেন। অপারেশন বন্ধ। অ্যানেশথেশিয়াসহ অন্যান্য কনসালটেন্ট নেই। প্রতিদিনই পাঁচ শতাধিক রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে যা সম্ভব সেভাবেই করা হচ্ছে। করোনার চিকিত্সাও দেওয়া হচ্ছে।
পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, ২০ জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও ১৯টিই শূন্য। মাত্র তিন জন চিকিত্সক দিয়ে চলছে এই হাসপাতালটির কার্যক্রম। তিনটি এক্সরে মেশিন বাক্সবন্দি পড়ে আছে বহু বছর। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু আল হাজ্জাজ বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে করোনা আইসোলেশন ইউনিটসহ চিকিত্সাসেবা যতটুকু সম্ভব তাই দেওয়া হচ্ছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, চিকিত্সকসহ জনবলের তীব্র সংকটে রোগীদের চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। কেউ সেবা পায়, কেউ পায় না। রোগীদের খাবার নিয়েও বড় দুর্নীতি হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ওমর ফারুক বুলবুল বলেন, বহুদিন ধরে এই সমস্যা চলছে। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। খাবারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, এখানে কোনো কনসালট্যান্ট না থাকায় গাইনি, সার্জারি, চোখ, নাক-কান ও গলার চিকিত্সা বন্ধ রয়েছে। অ্যানেশথেশিয়ালজিস্ট না থাকায় অপারেশন বন্ধ। একটি শিল্প এলাকা হিসেবে এ উপজেলায় করোনার চিকিত্সাসহ প্রাথমিক চিকিত্সার সব ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে জানান চিকিত্সকরা।
