তিস্তার পানি বিপত্সীমার ওপরে তিন জেলায় আকস্মিক বন্যা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২১, ০০:৪২

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিন জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সবগুলো ‘জলকপাট’ খুলে দেওয়ায় ভাটিতে বাংলাদেশ অংশে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফের বিপত্সীমার ওপরে উঠে গেছে তিস্তার প্রবাহ। ফলে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। নদী পাড়ের গ্রামগুলো ডুবে গেছে। বন্যার পানিতে ৫১৬ কিলোমিটার তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। রাতের আঁধারে হঠাত্ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

তিস্তা ব্যারাজের পানিবিজ্ঞান শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী ইলিয়াস আলী জানান, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব কটি গেট খুলে দেওয়ায় বাড়তে থাকে তিস্তার পানি, যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্যারাজ পয়েন্টে পানি কমে বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিনি বলেন, ভারত থেকে প্রচণ্ড গতিতে পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়ে পানির চাপ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরো কী পরিমাণ পানি আসবে, তা ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে পানি আরো বাড়তে পারে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানান, বন্যা মোকাবিলায় সকলপ্রকার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানিয়েছেন, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পাউবো সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১২টার দিকে একই পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার) যা বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাউবোর এক জন কর্মকর্তা জানান, ভারতের সিকিম উপত্যকা থেকে সৃষ্ট তিস্তা নদী ভারতে প্রবাহিত হয়ে লালমনিরহাট জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উজানে ভারতের অংশে ভারত সরকার বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তা নদীর পানি একতরফাভাবে ব্যবহার করছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে কোনো পানি থাকে না। আবার বর্ষাকালে অতিবর্ষণের সময় ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ অংশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় এবং সেই সঙ্গে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলা ছাড়াও নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলা। গত ৮ জুলাই সন্ধ্যা থেকে ভারত সরকার অতিমাত্রায় পানি ছেড়ে দেওয়ায় তিস্তার বাংলাদেশ অংশের অববাহিকায় দুই কূল উপচে বন্যার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। করোনাকালীন লকডাউনের এ সময়ে বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে তিস্তা পাড়ের মানুষ জন। আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে লালমনিরহাটের সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার তিস্তা-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে অভিন্ন এই নদীর ভারতীয় অংশের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। উজানে বাঁধ খুলে দেওয়ায় নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে নদীপারের গ্রামগুলোতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানিয়েছেন, বন্যায় ডুবে যাওয়া চর, দ্বীপচর ও নিম্নাঞ্চলে বহু মানুষ বসবাস করে। এরই মধ্যে তাদের খেত-খামার, বসতবাড়ি—সব ডুবে গেছে।

রংপুরসহ পাঁচ জেলার ১৪ উপজেলায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি

রংপুর থেকে ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার গোলাম মোস্তফা আনছারী জানান, ভারতের উজান থেকে আসা পানির ভয়ংকর ঢল সামাল দিতে ভাটিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর পরপরই বাড়তে থাকে পানি প্রবাহ। রাত সাড়ে ৯টায় পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার, যা বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপরে। রাত ১০টায় পানিপ্রবাহ ৫২ দশমিক ৮৩ সেন্টিমিটার এবং রাত ১১টায় ৫২ দশমিক ৯০ সেন্টিমিটার ছিল। ফলে ব্যারাজ রক্ষায় ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ভাটিতে পাঁচ জেলার ১৪ উপজেলায় তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পানি উঠেছে। তিস্তা অববাহিকার জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই পানি ঢুকে পড়েছে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালিগঞ্জ, আদিতমারী, সদর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, চিলমারী, উলিপুর এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলায় তিস্তা অববাহিকার ৫১৬ কিলোমিটারব্যাপী চর ও নিম্নাঞ্চল। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হঠাত্ রাতের বেলা বাড়ি ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে মানুষজন। রাতে চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চল থেকে মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে গবাদি পশুসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চলে যায়।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব ভুইয়া জানিয়েছেন, হঠাত্ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রকল্প কর্মকর্তাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে। যারা পানিবন্দি হয়ে পড়বে তাদের দ্রুতগতিতে উঁচু স্থানে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন তারা। পানিবন্দি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গঙ্গাচড়ার ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি, বিলীন ১৭ বাড়ি

রংপুরের গঙ্গাচড়া সংবাদদাতা কমলকান্ত রায় জানান, গঙ্গাচড়ায় মাত্র চার দিন আগে পানিবন্দি পরিবারের বাড়ির আঙিনা শুকাতে না শুকাতে আবারও ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ খুলে দেওয়ায় নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত থেকে বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার সাত ইউনিয়নের চরাঞ্চলসহ নিম্ন এলাকার বসবাসরত ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। কোলকোন্দ ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব আলী রাজু জানান, ভাঙন ও বন্যায় বিনবিনা চরে সাত পরিবারের বাড়ি বিলীন হয়েছে এবং ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাসলীমা বেগম জানান, পানিবন্দি পরিবারের জন্য ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।