নিখোঁজদের সন্ধানে মর্গে স্বজনদের আহাজারি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২১, ২২:৪৪

কল্পনা রানী বর্মণ। ছয় দিন আগে তিনি যোগ দেন সেজান জুস কারখানায়। বৃহস্পতিবারের ভয়াবহ আগুনের পর তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরকম ৫১ জন শ্রমিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাই মেয়েকে খুঁজতে ঢাকা  মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছুটে এসেছেন বাবা পরভা চন্দ্র বর্মণ।

ঘটনার দিন একই কারখানার দ্বিতীয় তলায় কাজ করছিলেন চম্পা খাতুন। তার মা মিনা খাতুন কাজ করছিলেন চতুর্থ তলায়। অগ্নিকাণ্ডের আগে

চম্পা তার কাজে নিচে নেমে যান। মা তখন ছিলেন চতুর্থ তলায়। আগুন লাগার পর আর মায়ের দেখা পাননি চম্পা। তাই মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে ছুটে এসেছেন তিনিও।

অসুস্থ স্বামী কাজ করতে পারেন না এ কারণে সংসারের হাল ধরতে তিন মাস আগে এই কারখানাটিতে কাজ নেন ফিরোজা বেগম। কারখানাটিতে আগুন লাগার পর তিনিও নিখোঁজ। তাই স্ত্রীর সন্ধানে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে ছুটে এসেছেন স্বামী জাহিদ। পরভা চন্দ্র বর্মণ, চম্পা খাতুন, জাহিদের মতো অনেকেই স্বজনদের খোঁজে ছুটে এসেছেন ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে। তাদের কারও মেয়ে, কারও মা, কারও ভাগনে, কারও আবার দূরসম্পর্কের আত্মীয় অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ রয়েছেন। স্বজনদের আহাজারিতে ঢাকা মেডিক্যাল মর্গ এলাকায় হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

বাবা হারা শান্তা মনি অভাবের সংসারের হাল ধরতে কাজ নেন ঐ কারখানাটিতে। আগুনের ঘটনার পর তিনিও নিখোঁজ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে শান্তা মনির খোঁজে আসা তার মামা বলেন, ‘আমার ভাগনি কারখানাটির তৃতীয় তলায় কাজ করত। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।’

‘আমার মেয়ে  কম্পা (১৪) কোথায়, আপনারা আমার কম্পাকে (কল্পনা রানী বর্মণ) ফিরিয়ে দিন, ফিরিয়ে দিন। আমি আমার কম্পাকে চাই।’ আদরের কিশোরী মেয়ের নাম ব?লে ঢাকা মে?ডি?ক্যা?ল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ম?র্গের সাম?নে এভাবেই কান্না করছিলেন বাবা পরভা চন্দ্র বর্মন।

পরভা চন্দ্র বর্মন ব?লেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মেয়ে কম্পা আমাকে ফোন করে বলল, ‘ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগছে’। এটাই তার  শেষ কথা, আর যোগাযোগ করতে পারেনি। এরপর সেখানে গিয়ে দেখি, আগুন জ্বলছে তো জ্বলছে। সারা রাত সেখানে ছিলাম। মেয়ের খবর পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘আজকে সবাই জানালো, যারা মারা গেছেন, তাদের লাশ ঢাকা নিয়ে যাচ্ছে।’

কল্পনা রানী বর্মণের ভাই জানান, তা?দের গ্রামের বা?ড়ি মৌলভীবাজারে। কিছু?দিন আগে নারায়ণগঞ্জের বরপা এলাকায় তার নানির বাড়ি ঘুরতে এসেছিল কম্পা। স্কুল বন্ধ, তাই ছয় দিন আগে এই ফ্যাক্টরিতে কাজে যোগ দিয়েছে। ওখানে তার  বোন চকলেট প্যাকেজিংয়ের কাজ করত।

মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে আশা চম্পা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাত ৮টায় কারখানার কাজ শেষে মায়ের সঙ্গে বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকালে আগুনের পর আর মাকে খুঁজে পাচ্ছি না। পরে শুনলাম ঢাকা মেডিক্যালে অনেকের লাশ এসেছে। ঢাকা মেডিক্যালে এসেও মায়ের দেখা পাইনি।’

স্ত্রীর খোঁজে আসা জাহিদ বলেন, ‘আমি আগে গার্মেন্টসে কাজ করতাম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছয় মাস ধরে বেকার আছি। আমি বেকার হয়ে যাওয়ায় তিন মাস আগে ৬ হাজার টাকা বেতনে আমার স্ত্রী কারখানাটিতে চাকরি নেন। ওভারটাইম দিয়ে মাসে আয় হতো ৯ হাজার টাকার মতো।’

তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে বৃহস্পতিবার সকালে। কারখানাটির চারতলায় আমার স্ত্রী কাজ করত। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় দিকে সে কারখানায় যান। এরপর আর ফিরে আসেনি।’