ডাক্তার তুমি কার (পর্ব-৩)

কেমন আছেন করোনা যুদ্ধের সাহসী চিকিৎসকরা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ০৮:৩৬

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম চিকিৎসা। দেশের চিকিৎসাসেবায় হালচাল নিয়ে ইত্তেফাক অনলাইনের চার পর্বের বিশেষ প্রতিবেদন। আজ থাকছে ৩য় পর্ব।

মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর খুব কাছের মানুষজনরা যখন চলে যায়, তখন পাশে থাকেন চিকিৎসকেরা। গত এক বছরে হাসপাতালগুলোয় তারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেরা যেমন আক্রান্ত হয়েছেন, পরিবারকেও আক্রান্ত করেছেন। এমনকি অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। তবু দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি চিকিৎসকরা। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৬২ জন চিকিৎসক।

No description available.

গত এক বছরের বেশি সময় করোনার ভয়াবহতা চলছে তার আপন গতিতে, তাণ্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছে সারাবিশ্বে। যেহেতু করোনা সম্পূর্ণ একটি নতুন রোগ, তাই শুরুতে এর চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং জনগণের মাঝে ভয়-ভীতি ছিল। এমনকি চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও কিন্তু আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। কারণ এর উৎপত্তি, জটিলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা কোনো কিছুই কারও জানা ছিল না।

শুরুতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে রোগী এবং তার স্বজনদের অভিযোগ ছিল অনেক। যেমন চিকিৎসকরা রোগীর কাছে যান না, গায়ে হাত দেন না, রোগের কথা শোনেন না, ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন না, টেলিফোনে চিকিৎসা দেন ইত্যাদি। নার্সেরা রোগীর সেবা পরিচর্যা ঠিকভাবে করেন না, ওষুধ খাওয়ান না, এমনকি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী রোগীর খাবার-দাবার ঠিকমত দেন না।

No description available.

তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক উন্নত। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম সারির যোদ্ধা, তারা সব ভয় জয় করে জীবন বাজি রেখে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে। করোনাকালের পুরো সময় অভাবনীয় সেবা দিয়েছেন এবং দিয়ে চলেছেন। করোনার চিকিৎসায় বর্তমানে চিকিৎসকরা যথেষ্ট দক্ষ, অভিজ্ঞ, তাদের পারদর্শিতা সব মহলে প্রশংসিত। সব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে তারা রোগীদের কাছে যান, তাদের কথা শোনেন এবং ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ চিকিৎসা দিচ্ছেন। নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও দক্ষতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেই পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের মৃত্যুর সংখ্যা কম।

No description available.

                                     (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান)

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখেই আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে। করানোর মহামারিতে সবার চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে যতজন চিকিৎসক মারা গেছেন ততজন চিকিৎসক মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রাণ হারাননি।

করোনা সংক্রমণের শুরুতে ও গেল বছরের জুনে সংক্রমণ প্রতিরোধে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ছিল। পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসামগ্রী (পিপিই) ও মানসম্মত মাস্কের সংকট ছিল। পাশাপাশি এগুলো ব্যবহারেও অসচেতনতা ছিল। যে কারণে বেশি সংখ্যক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুর ঘটনাও বেশি ঘটে।

No description available.

বিএমএ’র তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালের ৬ জুলাই সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৯৪৩ জন ডাক্তার  আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে দেশে ২ হাজার ২৩ জন নার্স এবং ৩ হাজার ৩০৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক অধ্যক্ষ বশির আহমেদ জানান, মহামারি করোনাভাইরাসে মানুষের সেবা দিতে গিয়ে নিজেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছি। আমার স্ত্রীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি আমাদের একমাত্রও মেয়ে আমাদের থেকে সংক্রমণ হয়ে সেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং যাবো।

No description available.

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসক বলেন, মানুষের সেবা দিতে গিয়ে আমরা নিজেরা এবং আমাদের পরিবারের সদস্যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সরকার  করোনাভাইরাসে প্রাণ হারানো এবং আক্রান্তদের বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে কিন্তু বাস্তবে দেশে করোনায় প্রথম চিকিৎসক মৃত্যুবরণকারী সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন আহমদ ছাড়া আর কেউ প্রণোদনা পাননি। এই প্রণোদনা আদৌ পাব কি না তা জানি না।

No description available.

                            (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন)

করোনা চিকিৎসায় চিকিৎসকদের প্রণোদনা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, করোনাকালের পুরোটা সময়ে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা অভাবনীয় সেবা দিয়েছেন। তারা তাদের শতভাগ দায়িত্ব পালন করেছেন। করোনার চিকিৎসায় বর্তমানে চিকিৎসকরা যথেষ্ট দক্ষ, অভিজ্ঞ, তাদের পারদর্শিতা সব মহলে প্রশংসিত।

চিকিৎসকদের প্রাণহানি ও প্রণোদনা নিয়ে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে এত চিকিৎসকের মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। চিকিৎসকদের যেসব প্রণোদনা প্রাপ্য ছিল, তা পাননি। তবে সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন খুব শীঘ্রই চিকিৎসকদের যেসব প্রণোদনা প্রাপ্য ছিল তা প্রদান করা হবে।

ইত্তেফাক/এসজেড