মাধব রায়
কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)
ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
১৮৫৪ সালে একজন বিজ্ঞানী ডাক্তার ডেভিড অল্টার (Dr. David Alter) আবিষ্কার করেন, প্রতিটি মৌলিক পদার্থের নিজস্ব বর্ণালি রেখা রয়েছে। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৮৫৯ সালে বিজ্ঞানী কার্শফ (Kirchooff) ও বুনসেন (Bunsen) বর্ণালি রেখার সাহায্যে রাসায়নিক মৌল চিহ্নিত করার চমত্কার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এভাবে বর্ণালিবীক্ষণবিদ্যা একটি পৃথক এবং অনন্য জ্ঞান হিসেবে প্রকাশ পায়।
এটি আমাদের কী কাজে লাগে? কণিকা জানতে চায়।
অনেক কাজে লাগে, নীলকান্তবাবু বললেন। ধাতব শিল্পে কোনও সংকর ধাতুতে মৌলিক ধাতুসমূহের অনুপাত সঠিকভাবে আছে কি-না, তা জানতে বর্ণালি বিশ্লেষণ করলেই হয়। এছাড়া সমপ্রসারণশীল মহাবিশ্ব তত্ত্ব
বিগব্যাং থিওরি? অণু বলল,
হ্যাঁ, বিগব্যাং থিওরি এই বর্ণালিবিদ্যার মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিন্তু ফ্রনহফার যে বললেন শোষণ বর্ণালি, এগুলো কী? আকাশ জানতে চায়।
নীলকান্তবাবু বললেন-উত্পত্তি ভেদে বর্ণালি দুই প্রকার। নিঃসরণ বর্ণালি ও শোষণ বর্ণালি। এদের প্রত্যেকটি আবার তিন প্রকার। রেখা বর্ণালি, পাড় বর্ণালি এবং অবিচ্ছিন্ন বর্ণালি।
প্রজ্বলিত কঠিন বস্তু বা বাষ্প, স্ফুলিঙ্গক্ষরণ, সোডিয়াম বাষ্পবাতি, পারদ বাষ্পবাতি, ক্ষরণনল প্রভৃতির মতো বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তেজিত বস্তু থেকে নিঃসৃত আলো দ্বারা সৃষ্ট বর্ণালি হচ্ছে নিঃসরণ বর্ণালি। আর ভুসা বা বাতির কালো ঝুল, প্লাটিনাম, রুবিগাস প্রভৃতি বস্তু দ্বারা আলোর শোষণে সৃষ্ট বর্ণালি হচ্ছে শোষণ বর্ণালি। সৌর বর্ণালি একটি শোষণ বর্ণালি।
এতটুকু বলে নীলকান্তবাবু বর্ণালির দিকে তাকালেন। তোমার ভালো লাগছে মামণি?
বর্ণালি কিছু বলছে না। তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে না, সে মজা পাচ্ছে কি-না, অথবা কেমন বুঝেছে। নিজের ছেলেমেয়ে ভাগনা ভাগনি এরা পুরোপুরি না বুঝুক, অনেকটা আত্মস্থ করতে পারে। আর না বুঝলে কিছুটা প্রশ্নও করে নেয়। মনে রাখতে পারবে কি-না, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন। একবারের শোনায় মনে রাখতে পারার কথাও নয়। মনে রাখতে গেলে অনেকবার চর্চা করতে হবে। কিন্তু বর্ণালি মেয়েটা কিছু বুঝতে পারছে কি-না আন্দাজ করা যাচ্ছে না। কারণ সে কোনও প্রশ্ন করছে না।
আকাশ প্রশ্ন করল-এই যে আমরা আলোর বর্ণালি সম্পর্কে জানলাম, এখানে বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, আর লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বেগুনির চেয়ে কম, আর লালের চেয়ে বেশি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের কোনও আলো নেই?
সুন্দর প্রশ্ন করেছিস, নীলকান্তবাবু বললেন। ঠিক শব্দ তরঙ্গের মতো, কম্পাংক ২০ থেকে ২০ হাজার হার্টজ এর মধ্যে থাকলে যেমন আমরা শুনতে পাই, কম বা বেশি হলে শুনতে পাই না, অন্য প্রাণীরা শুনতে পায়। কিন্তু ২০ এর কম বা ২০ হাজারের চেয়ে বেশি কম্পাংকের শব্দও তো রয়েছে। ২০ এর কম কম্পাংকের শব্দকে বলি শ্রবণেতর শব্দ, আর ২০ হাজারের বেশি কম্পাংকের শব্দকে বলি শ্রবণোত্তর শব্দ। আলোর বর্ণালির ক্ষেত্রেও এরকম রয়েছে। বেগুনির চেয়ে কম, আবার লাল এর বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি রয়েছে। তবে এদেরকে আমরা আলো বলি না।
এর মধ্যে কমলা কয়েকটা প্লেটে করে ফুচকা এনে দিলেন। ঘরে তৈরি, তিনি নিজ হাতে বানিয়েছেন। একটা প্লেট রাখলেন বর্ণালির সামনে, খাও বললেন। একটা বাটিতে তেতুল গোলা পানি, আর কয়েকটা চামচ দিলেন।
নীলকান্তবাবু বললেন, তুমিও এসে বসো, গল্প জমবে ভালো।
আসছি, তোমরা শুরু করো। বললেন কমলা।
সবাই একটা একটা করে ফুচকা খাচ্ছে আর গল্প শুনছে। নীলকান্তবাবু বললেন-বেগুনি আলো থেকে কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তিনটি রশ্মি আছে। প্রথমটি হলো গামা রশ্মি। এই রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে ০.০১ অ্যাংস্ট্রম থেকে ১.৪ অ্যাংস্ট্রম পর্যন্ত।
অ্যাংস্ট্রম কী? বর্ণালি বলল। এর আড়ষ্টতা একটু কমতে শুরু করেছে।
কণিকা বলল-এক সেন্টিমিটারের দশ কোটি ভাগের এক ভাগ হচ্ছে এক অ্যাংস্ট্রম।
হ্যাঁ বললেন নীলকান্তবাবু। আবার এক মিটারের এক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ। A এর ওপর ডিগ্রি চিহ্ন দিয়ে এভাবে লিখা হয় Ao। গামা রশ্মি পাওয়া যায় তেজস্ক্রিয় বস্তু থেকে, নিউক্লিয় ফিশন ও ফিউশন বিক্রিয়া থেকে। এই রশ্মি আবার আমাদের কাজেও লাগে। চিকিত্সাক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে, বিভিন্ন গবেষণা কাজে, ধাতব পদার্থের খুঁত নির্ণয়ে এই রশ্মি ব্যবহূত হয়। এরপর হচ্ছে রঞ্জন রশ্মি।
পরের অংশ আগামীকাল
