‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২১, ২১:৪৮

সমগ্র বিশ্ব আজ মহামারি করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত; কিন্তু করোনা লইয়া বিশ্ববাসীর ঘুম হারাম হইয়া গেলেও পৃথিবীব্যাপী কত মানুষ যে শুধু ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা যাইতেছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। বাংলার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই কবে লিখিয়াছেন—‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। এই ক্ষুধাই এখন পৃথিবীর এক নম্বর সমস্যা। ব্রিটিশভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতব্যসংস্থা অক্সফাম সম্প্রতি যে তথ্য জানাইয়াছেন তাহাতে এই কথারই সুর প্রতিধ্বনিত হয়। তাহাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি মিনিটে সাত জনের মৃত্যু হইতেছে করোনা ভাইরাসের কারণে। আর ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যুবরণ করিতেছে প্রতি মিনিটে ১১ জন। ইয়েমেন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া প্রভৃতি যুদ্ধবিধ্বস্ত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুর মিছিল ক্রমবর্ধমান। এই মৃত্যুর আরো একটি বড়ো কারণ—খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যপী খাদ্যের দাম বাড়িয়াছে ৪০ শতাংশ। তবে যুদ্ধবিগ্রহ ও ইহার কারণে সৃষ্ট সার্বিক অস্থিরতাই মূলত দায়ী। করোনা মোকাবিলায় আমরা ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও ইহার প্রয়োগের প্রতি এখন জোর দিতেছি; কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ বা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমরা খুবই উদাসীন।

পরিসংখ্যান বলিতেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি মানুষ আজ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন। বিশ্বে ১৫ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ আজ চরম ক্ষুধার্ত। পূর্বের বত্সরের তুলনায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়িয়াছে ২ কোটি। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, করোনার পূর্বে ক্ষুধা আমাদের মারিয়া ফেলিতে পারে। দেখা যাইতেছে, যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের আর্মস বা যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহূত হইতেছে। যুদ্ধজুজুর ভয় দেখাইয়া দেশে দেশে বাড়িতেছে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়। সম্প্রতি স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানাইয়াছে, গত বত্সর করোনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্য—এই পাঁচটি দেশ প্রতিরক্ষা খাতে সবচাইতে অধিক ব্যয় করিয়াছে যাহা বিশ্বের সম্মিলিত মোট ব্যয়ের ৬২ শতাংশ। আমেরিকায় অত্যাধুনিক সকল সমরাস্ত্র তৈরি করা হইতেছে। অথচ এই দেশটিতেও রহিয়াছে গরিব লোকের অস্তিত্ব। এই পৃথিবীটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন, তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও বদলাইয়া গিয়াছে; কিন্তু বিশ্ব ক্ষুধা ও দারিদ্র্য হইতে এখনো মুুক্তি পায় নাই। কেহ কেহ বলেন, বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলমান। ইহাতে আরেক দফায় বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিতে পারে; কিন্তু ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বের যে আকাঙ্ক্ষা সেইখানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন কি আসিবে?

প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণ অর্থ ও সম্পদের অব্যবস্থাপনা। বিশ্বনেতারা শুধু কথার ফুলঝুরিই ছড়াইতেছেন, তাহারা সেই অনুযায়ী কাজ করিতেছেন না। যেই সকল দেশে এই সমস্যা বিদ্যমান, সেই সকল দেশের নেতারাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারিতেছেন না। এই সকল দেশে রাষ্ট্রপরিচালনায় যাহারা আছেন তাহারা এমন ভাব করেন যেন তাহারা সকল কিছুই ম্যানেজ করিতেছেন; কিন্তু তাহারা জানেন না, দেশের মানুষকে তাহারা কতভাবে বঞ্চিত করিতেছেন। বিশ্বনেতারা পৃথিবীর সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টনে ব্যর্থ। যখন বিশ্ব সম্পদের বহুলাংশ কয়েকটি দেশের ও কয়েক জন ব্যক্তির হস্তে কুক্ষিগত হয়, তখন দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। জি-৭ দেশসমূহ (জাপান, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) বৈশ্বিক সম্পদের ৬৪ শতাংশের প্রতিনিধি যাহার পরিমাণ ২৬৩ ট্রিলিয়ন ডলার। আবার বিশ্বের মোট সম্পদের আশি শতাংশেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্রদেশসমূহ ও চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহ উন্নত বিশ্বে কাঁচামালের সরবরাহক; কিন্তু সেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার তাহারা করিতে না পারায় এবং তাহার উপর তাহাদের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এই ক্ষুধার রাজ্য ক্রমশ বাড়িতেছে। এই পরিস্থিতির অবসান কখন হইবে তাহা কেহ নিশ্চয়তা দিয়া বলিতে পারেন না।