আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ রাজনীতির সমীকরণ

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২১, ২১:৫৮

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আফগান যুদ্ধই হচ্ছে দেশের বাইরে দ্বিতীয় দীর্ঘতম যুদ্ধ। অবশেষে প্রায় দুই দশক ধরে চলা দীর্ঘ আফগান যুদ্ধের ইতি টানছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে কাতারের দোহায় যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেটি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বাইডেন এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সব সৈন্যকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ঐ ঘোষণার পর ন্যাটো জানায়, তারাও এই সময়ের মধ্যেই জোটটির সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এরই মধ্যে এই চুক্তিকে ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানামাত্রিক বিশ্লেষণ। তবে সব বিশ্লেষণকে ছাপিয়ে যে বিষয়টি মূল প্রাধান্য পাচ্ছে, তা হলো এই চুক্তি আসলে কি আফগানিস্তানে শান্তি আনতে পারবে?

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের চুক্তির পর থেকেই আফগানিস্তানে সহিংস হামলা বেড়েছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আফগান সরকারকে তালেবানদের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। কথিত শান্তি চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যদি মার্কিন সেনারা দেশে ফিরে যায়, তাহলে আফগান সরকারের পতন হয়ে পড়বে সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এতে যে শান্তি আসবে না, তা হলফ করেই বলে দেওয়া যায়। কারণ গত কয়েক বছরে ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং হামলা চালিয়ে গেছে তালেবানরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সেনা প্রত্যাহার মানে দেশটিতে তালেবান আরো শক্তিশালী হবে। চলমান সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সম্প্রতি আফগানিস্তানে হামলা বাড়িয়েছে তালেবান। গত কয়েক দিনে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি প্রায় ১০০ জেলা কেন্দ্র দখল করেছে। এসব হামলায় অনেক বেসামরিক নাগরিক নিহত, আহত এবং কয়েক হাজার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবে আফগানিস্তানত্যাগী যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সেনাদের ওপর কোনো আঘাত হানছে না। আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে যে, চলমান এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশটি শিগিগর গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে। এটি বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের নেতৃত্বে থাকা কমান্ডার জেনারেল অস্টিন এস মিলার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আফগানিস্তান বিশৃঙ্খলা ও বহুপাক্ষিক গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

আফগান যুদ্ধে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি লিপ্ত থাকলেও অন্যান্য দেশ পরোক্ষভাবে জড়িত। আফগানিস্তানে চীনের বড় একটি স্বার্থ হলো, রোড অ্যান্ড বেল্ট প্রকল্পের অবকাঠামো তৈরি করে প্রকল্পটি কার্যকর করা। আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। আর দেশটিতে ভারতের প্রভাব বজায় থাকলে দিল্লি কর্তৃক এই প্রকল্পের বিরোধিতার কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সাধন সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া চীনের একেবারেই দোরগোড়ায় আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি বেইজিংয়ের জন্য সব সময় উদ্বেগের কারণ। চীন, রাশিয়ার আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যিক কারণে আফগানিস্তানের বিষয়ে আগ্রহী হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্ক এবং কাশ্মীর-সংকটে আফগানিস্তানের ভূরাজনীতিতে ভারতের বড় রকমের স্বার্থ রয়েছে। আফগানিস্তানে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে ২০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে ভারত। চুক্তি কার্যকর হওয়া মানে ভারতের এই বিনিয়োগ নষ্ট হওয়া। বর্তমান চুক্তি যেমন তালেবানকে লাভবান করবে; তেমনি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে। পাকিস্তান চাইবে তার প্রভাববলয় সংহত করার বাসনায় তাদের মদদপুষ্ট তালেবান সরকার কাবুলে প্রতিষ্ঠিত হোক। অন্যদিকে ভারত চাইবে পাকিস্তানি প্রভাবমুক্ত আফগানিস্তান। তবে আফগানিস্তানে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত কট্টর ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠা হোক, এটা ভারত ও ইরানের কারোর কাম্য নয়। কারণ আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইরান-আফগান সীমান্তে শিয়া অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে তালেবানবিরোধী ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয়। একইভাবে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে তাজিক, হাজারা ও উজবেক জনগণের বসবাস রয়েছে। তারা পশতুন জনগোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তালেবান বাহিনীকে সহজে গ্রহণ করবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি অশান্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শান্তির অভিপ্রায়ে সব গোষ্ঠী কতটা আন্তরিকভাবে এই বিপত্তিগুলোর সমাধান করে, এটিই এখন দেখার বিষয়। এত প্রাণ, রক্ত, অর্থ, আহত, অবকাঠামো ধ্বংসের পর আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ রাজনীতির সমীকরণ কোন দিকে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়