কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে পানিতে শরীর ভাসিয়ে চলাচল করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় সাঁতার। সাঁতার একধরনের শারীরিক ব্যায়াম। নিয়মিত সাঁতার কাটলে একজন ব্যক্তির ফুসফুস ও হূদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যায় এবং গবেষণায় দেখা গেছে যে, একজন সাঁতারুর মৃত্যুর আশঙ্কা কর্মহীন ব্যক্তির অর্ধেক। সপ্তাহে কেউ যদি আড়াই ঘণ্টা করেও নিয়মিত সাঁতার কাটে, তাহলে তার ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হূদেরাগ এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাধির ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু সাঁতারের প্রয়োজনীয়তা কি শুধু ব্যায়ামে সীমাবদ্ধ? জীবন বাঁচাতেও সাঁতারের বিশেষ অবদান রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনামে দেখা যায় পানিতে ডুবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ স্থল। বাংলাদেশেও রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবাসহ অসংখ্য জলাভূমি। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্ষাকালে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৫০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে ৩২ জন চার বছরের কম বয়সি। প্রতি বছর ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ জন পানিতে ডুবে মারা যায়, তন্মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। বাংলাদেশে এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুদের মোট মৃত্যুর ৪৩ শতাংশ পানিতে ডুবে মারা যায়।সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিশুরা পানিতে ডুবছে বাড়ি থেকে ২০ গজের মধ্যে পুকুর, ডোবা কিংবা খাল-বিলে। আর ঘটনাগুলো সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ঘটছে। কারণ এ সময় পিতামাতা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থকায় শিশুর খোঁজখবর নিতে পারেন না।
গ্রামের ছেলেমেয়েদের তুলনায় শহরের ছেলেমেয়েরা সাঁতার শেখার প্রতি বেশি উদাসীনতা প্রকাশ করে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-দীঘিগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে তাদের নদী-নালা, খাল-বিলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে হয় এবং নিজেদের প্রয়োজনেই সাঁতার শিখতে হয়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা পিতা-মাতা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সহায়তায় সাঁতার শেখে, কিন্তু শহরের ছেলেমেয়েরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আবার কখনো অভিভাবকেরা সন্তানের সাঁতার শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, অনেকে ঝুঁকির কারণে সন্তানকে নদী বা পুকুরে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যান না। এ কারণে অকালেই ঝরে যায় অসংখ্য তাজা প্রাণ। অনেকে শখের বসে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে ভ্রমণে যায়, কিন্তু পরে পরিবারের কাছে লাশ হয়ে ফিরে আসে। তারা সাঁতার জানে না, কিন্তু কৌতূহলবশত বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নদীতে নেমে গভীর জলে তলিয়ে যায়। দেশের নদীগুলোতে নৌকাডুবি ও লঞ্চডুবি যেন অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। লঞ্চডুবি কিংবা নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়। আর ততক্ষণে সাঁতারে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। সাধারণত সাঁতারু ব্যক্তিরা সহজেই পানিতে ভেসে থাকতে পারে। ফলে পুকুর, নদ-নদী কিংবা খাল-বিলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে পারে। কিন্তু যারা সাঁতার জানে না, তাদের কাছে পুকুর-জলাশয়, নদী-নালা, খাল-বিলগুলো যেন কূপের মতোই ভয়ংকর স্থান! ফলে সাঁতারে পারদর্শীরা বড় দুর্ঘটনার সময় আশপাশে থাকা লোকজনের সহায়তায় জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়।
প্রত্যেক পিতামাতাকে সন্তানের ভবিষ্যত্ চিন্তা করে তাদের সাঁতার শেখাতে হবে। একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে, শহরে কিংবা গ্রামে বসবাসের সঙ্গে সাঁতার শেখার কোনো সম্পর্ক নেই। বর্ষাকালে চারদিক পানিতে ডুবে যায়, তাই ছোট শিশুরা যেন কোনো অবস্থাতেই চোখের আড়াল হতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে আর নিজের জীবন বাঁচাতে অবশ্যই সাঁতার শিখতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
