সমাজে ভিন্ন চিন্তাধারা, ভিন্ন দর্শন ও ভিন্ন মতের অসংখ্য মানুষের বাস। স্বাভাবিকভাবেই একজনের সঙ্গে অন্যজনের মতের অমিল থাকতে পারে। কিন্তু নিজের মতের সঙ্গে না মেলায় অন্যের প্রতি অশ্রদ্ধা কখনোই কাম্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ফেসবুক পোস্টগুলো দেখে মনে হয়, এক দল আরেক দলের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। পোস্ট, কমেন্টে অশ্লীল বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণের ছড়াছড়ি। আবার বিনোদন ও ক্রীড়াজগতের তারকাদের ফেসবুক প্রোফাইলের বিভিন্ন পোস্টে গিয়ে দেখা যায়, কমেন্ট সেকশন নানাবিধ কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে ভরপুর। এই মন্তব্যগুলোতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালাগালি এমনকি অনেক সময় প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেখা যায়। এ ধরনের মন্তব্যের সংখ্যা নেহাত কম নয়। মাত্র কয়েক বছর আগেও এ ধরনের প্রবণতা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা মারাত্মক রূপ লাভ করেছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ফেসবুক ব্যবহারকারী। সামাজিক, ব্যাবসায়িক কিংবা জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত মতামত প্রদানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ব্যবহারকারীদের পোস্ট, কমেন্ট কিংবা শেয়ারকৃত পোস্ট থেকে মানুষ সমাজ নিয়ে, দেশ নিয়ে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে কী ভাবছে তার একটি সহজ ধারণা পাওয়া যায়। তা ছাড়া কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ফেসবুক দিনে দিনে একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রটিও সমাজের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, হেইটস্পিচ ছড়ানো, অন্যের মতামতের প্রতি অসহিষ্ণুতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, উসকানিমূলক পোস্ট, পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, অনেক সময় বাস্তব জীবনেও ঘটনাগুলোর প্রভাব দেখা যায়। দেশের বেশ কিছু স্থানে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বিরোধ, সংঘাত এমনকি অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার সার্বিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবও সমাজকে অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনলাইনে অসংলগ্ন কথাবার্তা ও দাম্ভিকতার ছাপ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চর্চাও দেখা গেছে মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে ভিনদেশি তারকাদের পাবলিক পোস্টে অপরিপক্ব ও নেতিবাচক মন্তব্য জাতি হিসেবে সব বাংলাদেশির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ফেসবুকে যে ভাষায়ই মন্তব্য বা পোস্ট করা হোক না কেন, তা খুব সহজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করা যায়। এ ধরনের পোস্টগুলো তাই আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশিদের সম্মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
অনলাইন মিডিয়ায় বেপরোয়া মন্তব্য ও পোস্ট শেয়ার করার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ফেসবুক বা ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশের আগে কারোরই এ বিষয়ে সঠিক ধারণা থাকে না, সুযোগ থাকে না কোনো ধরনের অরিয়েন্টেশনের। তাই কোথায় কী ধরনের মন্তব্য করা উচিত এবং কোন পরিস্থিতিতে কী রকম পোস্ট শেয়ার করা দরকার, সে সম্পর্কে তারা কখনো ভেবেও দেখে না। বেশির ভাগ ব্যবহারকারীই ফেসবুককে কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম মনে করে থাকে। এর মাধ্যমে যে ব্যবহারকারীর সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে; সে ব্যাপারে তারা থাকে উদাসীন। আরেক শ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ রয়েছে, যাদের সবকিছু নিয়েই অভিযোগ এবং তারা সেই অভিযোগগুলোকেই তুলে ধরতে চায় ফেসবুকের মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ মতের অমিল হলেই পোস্টদাতা বা কমেন্টকারী ব্যক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত শত্রু মনে করতে থাকে। এ থেকেই সূত্রপাত ঘটে বড় ধরনের বিদ্বেষের। মূলত, এগুলোই অনলাইন প্ল্যাটফরমে নেতিবাচকতা, বিদ্বেষ কিংবা সংঘাত ছড়ানোর প্রধান কারণ। এমনকি এ ধরনের আচরণের জন্য ব্যবহারকারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী।
তবে কারণ সন্ধানের চেয়ে এর সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়াটাই বেশি জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘সোশ্যাল মিডিয়া অরিয়েন্টেশন’ অপরিচিত একটি শব্দ। এটি হলো এমন একটি গাইডলাইন, যার মাধ্যমে ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার উপযোগী আচরণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারে। বাংলাদেশে ‘সোশ্যাল মিডিয়া অরিয়েন্টেশন’ ধীরগতিতে হলেও চালু করা দরকার। অন্যদিকে কোনো কোনো আইডি ও পেইজ থেকে উসকানিমূলক, অপ্রীতিকর পোস্ট ও কমেন্ট শেয়ার করা হচ্ছে, সেগুলো শনাক্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনারও ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা, সমালোচনা সহ্য করার মতো মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের উত্কর্ষতার এই যুগে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত মানসিকতা গঠনেরও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াও আমাদের জীবনের অনেক কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এ জন্যই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সোশ্যাল’ ও পরিপক্ব আচরণও খুব বেশি দরকার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
