মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার-কর্মচারী সংকট ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সরঞ্জামের অভাবে করোনাসহ সার্বিক চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অপারেশন বন্ধ প্রায় এক যুগ ধরে। জনবল সংকটে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসহ চিকিত্সা সামগ্রী দীর্ঘদিন ব্যবহূত না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জনবল সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অন্যান্য উপজেলার মতো এখানেও ওয়ার্ডবয় ও সুইপাররা চিকিত্সা সেবা দিচ্ছেন। গতকাল শনিবার দুপুরে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান, জরুরি বিভাগে ওয়ার্ডবয় আবুল হাশেম একজন রোগীর ড্রেসিং করছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের ৪৯২ টি উপজেলা হাসপাতালে নির্ধারিত জনবল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সচল থাকলে গ্রামাঞ্চলের ৮০ ভাগই করোনামুক্ত রাখা সম্ভব হতো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল ও চিকিত্সা সামগ্রী সংকট ভয়াবহ। করোনার প্রায় দেড় বছর পার হচ্ছে। আমরা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে সেভাবে সাজাতে পারিনি। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পর্যায়ে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ওয়ার্ড পর্যায়ে হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক আছে ঠিকই, কিন্তু জনবল ও চিকিত্সা সামগ্রী সংকটের কারণে মানুষ সেবা পাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘মহামারি হলো একটা যুদ্ধ। আর যুদ্ধের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবেন তিনি, যিনি যুদ্ধ সম্পর্কে জানবেন। করোনা মহামারি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া চিকিেকর কাজ। সঠিক লোক দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা না করলে যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত।’
অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ আরো বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার। কিন্তু তিনি সব সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ইউএনওরা সেখানেও খবরদারি করেন। উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবার ভঙ্গুর দশার এটা একটা কারণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক সুন্দরভাবে পরিচালিত হলে গ্রামের ৮০ ভাগ করোনামুক্ত করা সম্ভব।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনা মহামারি আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা না নিলে সামনে হবে আরো ভয়াবহ অবস্থা। রোগীরা রাস্তায় মারা যাবে। জনগণও এখন বুঝে গেছে যে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশার জন্য দায়ী কে? সঠিক লোক দিয়ে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হলে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?
গজারিয়া উপজেলায় এক লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ মানুষ বসবাস করেন। এছাড়া ৮৭ মিল-কারখানার জনবলসহ মোট ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষের বসবাস সেখানে। গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দৈনিক আউটডোর ও ইমার্জেন্সি বিভাগে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী সেবা নিতে আসেন। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিত্সকের পদ আছে ২৯টি। কনসালটেন্টের পদ ১০টি থাকলেও আছেন মাত্র দুইজন। একজন গাইনি কনসালটেন্ট, অন্যজন অর্থপেডিকস কনসালটেন্ট। আরএমওসহ মেডিক্যাল অফিসারের ১৯টি পদ আছে। এরমধ্যে ৯ জন মেডিক্যাল অফিসার আছেন। বাকি ১০টি পদে জনবল নেই। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩৮টি পদে জনবল নেই। এই উপজেলায় করোনা আক্রান্তের হার ৪০ শতাংশ। উপজেলায় ৮টি ইউনিয়নে ৮টি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক আছে ১৮টি। করোনার জন্য ৫টি বেড রাখা হয়েছে। ২৮টি অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে, খালি আছে অর্ধেক। একটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে। এই কনসেনট্রেটরে ক্যানোলা দিয়ে ৫ জন রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অর্থপেডিকস কনসালটেন্ট একাই গতকাল ৬৭ জন রোগী দেখেছেন। করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য আলাদা চিকিত্সা সেবার ব্যবস্থা আছে। টিকা দিতে আলাদা শেড আছে। জনবল সংকটের মধ্যেও সীমিত জনবল দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি সর্বাত্মক চিকিত্সা সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্মরত ডাক্তাররা জানান, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ৩১ শয্যারও জনবল নেই। জনবল সংকট না থাকলে উপজেলার করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। তারা আরো বলেন, শুধু এই হাসপাতাল নয়, সারাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল সংকট দূর করা হলে দেশকে করোনামুক্ত করা সম্ভব।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘জনবলসহ চিকিত্সা সামগ্রী সংকট আছে। তবু সীমিত জনবল দিয়ে আমরা সাধ্যমতো চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সেবা ছাড়া কেউ ফিরে যান না।’
