ছবি নিয়ে মর্গে নিখোঁজ মায়ের খোঁজে সোমা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২১, ২২:৫৬

সাত বছরের শিশু সোমা। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। তিন দিন ধরে সে তার মা আমৃতা বেগমের (৩০) খোঁজ পাচ্ছে না। আগুনে পুড়ে যাওয়া হাশেম ফুডসে বৃহস্পতিবার সকালে কাজ করতে গিয়েছিল তার মা। খালা রোজিনা বেগম আর খালু হাতেম আলীর হাত ধরে গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে এসেছিল নিখোঁজ মাকে খুঁজতে। তার হাতে ছিল মায়ের আইডি কার্ড। কিন্তু কেউ তাকে আশার কথা শোনাতে পারেনি। শিশুটিও এখন বুঝে গেছে তার মা আর বেঁচে নেই। মৃত মায়ের মুখটিও এখন আর সে দেখতে পাবে না। ঐ কারখানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৪৯টি মৃতদেহের মধ্যে হয়তো তার মায়ের লাশটিও আছে?      কিন্তু লাশগুলো এতটাই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে, দেখে শনাক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কীভাবে মায়ের লাশ পাবে সোমা? সিআইডির ক্রাইম সিন শিশুটির কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়েছে। ম্যাচিং করার পর যদি কোনো লাশের সঙ্গে মেলে তাহলেই হয়ত মায়ের লাশটি পাবে সোমা।  

সোমার মতো আরো ৪২ জন এসেছেন গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে। তারাও স্বজনের লাশ খুঁজছে। সবার কাছ থেকেই ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে। ম্যাচিং করার পরই লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে বলে মর্গে ইত্তেফাককে জানালেন সিআইডি ডিএনএ ল্যাবরেটরির পরীক্ষক মাসুদ রাব্বি। তিনি বলেন, এটা করতে এক মাসও লেগে যেতে পারে। নিখোঁজ অমৃতার বোন রোজিনাও একই ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে রোজিনা বলেন, ‘আমি অন্য ভবনে ছিলাম। যে ভবনটিতে আগুন লেগেছে, ওটার চার তলায় অমৃতা কাজ করত। চার তলার গেটে কলাপসিবল গেট লাগানো থাকায় ওরা বেরুতে পারেনি। ওদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে। লাশটিও খুঁজে পাচ্ছি না। এখন আমি এই এতিম শিশুটিকে কী জবাব দেব? 

মাসুদ রাব্বি বলেন, উদ্ধার করা লাশগুলো এতটাই পুড়েছে যে, তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। যাদের স্বজন নিখোঁজ, মিলিয়ে দেখতে তাদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত ৪২ জনের স্বজন থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জের ঐ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর ৪৯ জনের মৃতদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। লাশগুলো এতটাই পোড়া যে, দেখে শনাক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। রোজিনা জানালেন, মাত্র এক মাস আগে পহেলা জুন কাজে যোগ দিয়েছিলেন অমৃতা। দিনে ১২ ঘণ্টা ডিউটি করে বেতন নির্ধারণ হয়েছিল সাড়ে ৫ হাজার টাকা। এখনো জুন মাসের বেতন পাননি। ফলে বেতন পাওয়ার আগে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন অমৃতা।

কারখানার সিনিয়র অপারেটর মোহাম্মদ আলীর (২৮) খোঁজে ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে এসেছিলেন তার বাবা শাহাদত হোসেন আর ভাই টিপু সুলতান। পাবনার সুজানগর আটখালির ঘনশংকর বাসিন্দা শাহাদত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আগুন লাগার পর ছেলে তাকে ফোন দিয়েছিল। সে শুধু বলেছে, গেইটে তালা, চারদিকে আগুন। কয়েক মাস আগে মোহাম্মদ আলীর মা রোকেয়া খাতুন মারা গেছেন। তার চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন মোহাম্মদ আলী। নূর মোহাম্মদ নামে দুই মাসের একটি সন্তান রয়েছে মোহাম্মদ আলীর। ছোট ভাই টিপু সুলতান বলেন, তিন বছর ধরে ঐ কারখানায় ২৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন মোহাম্মদ আলী। গতকাল সকালে সন্তানের খোঁজে মর্গে আসেন নিখোঁজ মিতুর (১৬) বাবা বিল্লাল হোসেন। তিন মাস আগে ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন মিতু। তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে।

নরসিংদী থেকে বৃদ্ধ জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী জোসনা বেগম মেয়ে লিমার (২৩) খোঁজে মর্গে আসেন। কিশোরগঞ্জের পটিয়াদী থেকে রাবিবার (২৩) খোঁজে এসেছিলেন তার বাবা চান্দু মিয়া। ফুড ইঞ্জিনিয়ার জিহাদ রানার (২৭) খোঁজে আসেন তার বাবা শওকত হোসেন খোকন। জিহাদের বাড়ি জামালপুর সদরে, ঐ কারখানায় চার বছর ধরে চাকরি করতেন তিনি। মেয়ে সেলিনার (১৪) জন্য কিশোরগঞ্জ থেকে এসেছেন মা আমেনা বেগম ও বাবা মোহাম্মদ সেলিম। ঐ কারখানা থেকে উদ্ধার করা ৪৯টি লাশের মধ্যে ১৫টি গতকাল সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে জায়গা না হওয়ায় লাশগুলো সেখানে পাঠানো হয়।