খুলনায় করোনা কেড়ে নিয়েছে মানুষের উপার্জনের পথ

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ২১:১৯

এনামুল হক, খুলনা অফিস

খুলনায় মহামারি করোনা কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের উপার্জনের পথ। অনেকের ঘরে খাবার নেই, আবার অনেকে দিতে পারছেন না বাড়ি ভাড়া। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে এই ভেবেই কাটছে তাদের অনিশ্চিত জীবন।

খুলনা মহানগরীর টুটপাড়া গাছতলা এলাকার বাসিন্দা সোহেব খান হতাশার সুরে বলেন, ‘স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে খুবই কষ্টের মধ্যে আছি। করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রায় দুই মাস হাসপাতাল আর বাসায় কাটাচ্ছি। বেসরকারি একটি সংস্থায় চাকরি করতাম, অসুস্থতার কারণে প্রায় দুই মাস অফিসেও যেতে পারি না। বেতনও বন্ধ। আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুদের কাছ থেকে ধারদেনা করে এতদিন চলেছি। এখন আর কারো কাছে ধারদেনাও করতে পারছি না। দুই মাসের ঘর ভাড়া ৮ হাজার টাকা বাকি পড়েছে। তাও দিতে পারছি না। আমার এখন কোনো আয় নেই। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বেশির ভাগ দিন উপোস থাকতে হচ্ছে।

একটি বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) চাকরি করতেন, সুকোমল কুন্ড। তিনি বলেন, চাকরিতে ভালোই বেতন পেতাম। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ভালোই কাটছিল দিন। মাস শেষে গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবাকে কিছু টাকাও পাঠাতাম। কিন্তু করোনার অজুহাত দিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রথমে বেতন অর্ধেক করে দেয়। প্রথম প্রথম মনে করেছিলাম, এই সমস্যা সাময়িক। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই, একদিন এক নোটিশে চাকরিটাও চলে গেল। এখন বেকার অবস্থায় দিন কাটছে। গ্রামের বাড়িতে চলে আসার পর স্ত্রী-সন্তানও গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। জমানো টাকাও শেষ হয়ে গেছে। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে জানি না। শুধু সোহেব খান আর সুকোমল কুন্ডই নয়, খুলনা অঞ্চলের কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষই মহামারি করোনার মধ্যে ভালো নেই।

খুলনা মহানগরীর এ কে টাওয়ারের ম্যাস ফ্যাসনের মালিক আনিসুজ্জামান জানান, করোনার আগে তার দোকানে প্রতিদিন ১৪-১৫ হাজার টাকার মালামাল বিক্রি হতো। করোনার কারণে অধিকাংশ সময়ই মার্কেট বন্ধ ছিল। এখন লকডাউনে তো দোকান খোলার প্রশ্নই আসে না। তিনি জানান, দোকান বন্ধ থাকার কারণে বেতন না দিতে পেরে তার দুই জন কর্মচারীর মধ্যে একজনকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছি।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিসি) খুলনা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল হক সোহেল বলেন, জলিল টাওয়ারের কম্পিউটার মার্কেটসহ খুলনা মহানগরীতে প্রায় ১০০টি কম্পিউটারের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা চার শতাধিক। কিন্তু করোনার কারণে দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ ছিল। মাঝে কিছুদিন খুললেও খুলনা অঞ্চলে করোনা ভাইরাস বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর লকডাউন দেওয়া হয়েছে। ফলে দোকানপাটসহ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় একদিকে ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়ছে, অন্যদিকে, কর্মচারীদের বেতন আর সংসার চালাতে গিয়ে কম্পিউটার ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।

খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর রেল ক্রসিংয়ের পাশে ছোট একটি দোকানে শিঙাড়া ও পুরি বিক্রি করেন মিঠু মিয়া। কিন্তু এত বেকায়দায় আগে কখনো পড়েননি তিনি। সংসারের খাওয়া-পরা, ঘর ভাড়া, দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচসহ সবই  চলতো তার এই দোকানের আয়ে। তবে লকডাউন ঘোষণার পর থেকে দোকান খুলতে পারছেন না, তাই আয়-রোজগারও বন্ধ। এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে সংসার চালাতে।

নগরীর সাতরাস্তার মোড়ে কথা হয়, শ্রমজীবী জব্বার মিয়া, মোসলেম ও রবিউলের সঙ্গে। তারা বলেন, করোনার মধ্যে কেউ কাজে নিচ্ছে না। আবার কেউ সাহায্যও করছে না। ফলে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে আমাদের। নগরীর বসুপাড়া এলাকার রেবেকা সুলতানা নামে একজন গৃহবধূ জানান, তার স্বামী একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করেন। গত দুই মাস ধরে তার বেতন বন্ধ। একমাস কোনোভাবে চললেও এখন আর বাজার করার পয়সাও নেই। তাদের চার জনের সংসার চলছে খুব কষ্টে।

খুলনার জেলা প্রশাসক মো: মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের খাদ্যসহায়তাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলেও ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পেতে পারেন।