মর্গে আহাজারি ‘শুধু লাশ চাই’

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ২২:১৪

শিফট শেষ হওয়ায় রাজীব হোসেন কারখানার বাইরে এসে খাবার খাচ্ছিলেন। তার স্ত্রী আমেনা বেগমের শিফট তখনো চলছিল। হঠাত্ নিচতলার ফ্লোরগুলোতে আগুন দেখতে পান রাজীব। স্ত্রীর কথা চিন্তা করে লাফ দিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ওপরে ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় আগুন থাকায় আর ভেতরে যেতে পারেনি। ভেতরে আটকা পড়ে মারা যান তার স্ত্রী। রাজীব এখন স্ত্রীর লাশের জন্য ঘুরছেন। চিত্কার করে বলছেন, ‘আমি লাশ চাই।’

গতকাল রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে স্ত্রীর লাশের খোঁজে আসেন রাজীব। সঙ্গে চার বছরের ছেলে রাফিন। ছোট্ট ছেলেটির জিজ্ঞাসা, ‘মা কখন ফিরবে?’ নানা মুর্শিদ মিয়া মেয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ নমুনা দিয়ে এসেছেন। বাবার কোলে চড়ে ছোট্ট রাফিন অবাক দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকাচ্ছে। রাজীব বললেন, ওকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। ও এখনো কিছু জানে না। ও জানে মা দাদাবাড়ি গেছে। কালকে আসবে। রাজীব জানালেন, আগুন লাগার পর চারতলায় তার স্ত্রী আমেনার সঙ্গে থাকা একজন বাইরে থাকা এক সুপারভাইজারকে মোবাইলে কল করে বলছিলেন, ‘আমরা দম নিতে পারতেছি না। আমাদের বাঁচান।’ কিন্তু ঐ ফ্লোরে তালা মারা থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। রাজীব অভিযোগ করেন, এই কারখানার বিভিন্ন সেকশনে বাচ্চাদের খাবার তৈরি হওয়ার কারণে কেউ যাতে খাবার না নিয়ে যেতে পারে, তাই ফ্লোরগুলোতে সব সময়ই তালা মেরে রাখা হতো। রাজীব ৬ হাজার টাকা এবং আমেনা ৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন সেজান জুস কারখানায়। রাজীব বলেন, ‘কারখানার মালিক কোটি কোটি টাকার মালিক। তাদের সঙ্গে কি পারব? বিচার কি আর হইব? আমাদের চাওয়ার কিছু নাই। লাশটা যেন পাই। দ্রুত আমাদের লাশটা দেওয়ার ব্যবস্থা যেন করা হয়।’

কার গাফিলতিতে অগ্নিকাণ্ড? খুঁজছে পুলিশ :সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম, তার চার ছেলেসহ আট জনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। গতকাল ছিল চার দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন। জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানায়, শনিবার রাত থেকেই তাদের দফায় দফায় একাধিক টিম জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কখনো কারখানার মালিক আবুল হাশেমকে একা, আবার কখনো সবাইকে আলাদা আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং ৫২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পেছনে মালিকপক্ষের কী কী গাফিলতি রয়েছে, কী ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি কোন কোন সংস্থার দায়িত্ব ছিল নিয়মিত কারখানা মনিটরিং করা, তা-ও জানার চেষ্টা করছে জেলা পুলিশের একাধিক টিম। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের পর জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিসহ একাধিক তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ণয় এবং কারখানার পরিবেশ নিয়ে তদন্ত করছে। সেজান জুস কারখানায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতিসহ ওঠানামার মাত্র দুটি সিঁড়ি নিয়েও তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কে বা কারা চতুর্থ তলায় তালা লাগিয়েছিল, তা-ও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে। তবে আবুল হাশেম তাদের গাফিলতি কিংবা দায়িত্বহীনতার কথা স্বীকার করেননি। পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতদের আমরা বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

দোতলা থেকে লাফিয়ে রক্ষা পায় শিশু হালিমা :অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত কিশোরী হালিমা আক্তার এখন মা-বাবাসহ স্বজনদের চিনতে পারছে। ১৩ বছর বয়সি এই শিশু শ্রমিককে বৃহস্পতিবার ঘটনার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। মাথায় আঘাত পেয়ে অচেতন ছিল সে। তিন দিন পর গতকাল জ্ঞান ফিরলে মা-বাবাসহ স্বজনদের চিনতে ও তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারছে।

মরদেহ থেকে হাড় ও দাঁতের নমুনা সংগ্রহ সিআইডির :আগুনে পুড়ে যাওয়া নিহতদের পরিচয় শনাক্তে ৬৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করছে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৪৫টি মরদেহের বিপরীতে ঐ ৬৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সিআইডি জানিয়েছে, মরদেহগুলো খুব বাজেভাবে পুড়ে যাওয়ায় ডিএনএ প্রোফাইলিং করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এ কারণেই নিহতদের পরিচয় জানতে এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে।

নিহত প্রত্যেকের ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে রিট :ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫২ শ্রমিকের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে আহতদের প্রত্যেককে ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। রিট আবেদনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রুল জারির আরজি জানানো হয়েছে। গত শনিবার কয়েকটি মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তাকারী সংগঠন ই-মেইলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর রিট আবেদনটি পাঠায়। তবে আপাতত নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ এবং আহতদের জন্য ৫ লাখ টাকা করে দিতে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল :গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল। পরিদর্শন শেষে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক বলেছেন, সেজান জুসের আগুনের ঘটনায় দোষীদের শাস্তি পেতেই হবে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ করছেন। শ্রমিকদের প্রাণহানি মেনে নেওয়া যায় না। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এ সময় প্রতিনিধিদলের সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস এমপি, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ আব্দুল আউয়াল, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসনাত শহীদ বাদল, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, নজরুল ইসলাম বাবু এমপি, রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের দায় সরকারকেই নিতে হবে—ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী :গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের দায় সরকারকেই নিতে হবে। দায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। নিহতদের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহতদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসন করতে হবে। গতকাল আগুনে ভষ্মীভূত ভবন পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, গণসংহতি আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম সুজন, ব্যারিস্টার আব্দুল কাইয়ুম, পপি রাণী সরকার প্রমুখ।