ভুল মামলায় তিন বছর জেল খেটে জামিনে মুক্তি পেয়ে গতকাল সোমবার ভোরে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান জাহালম। তাকে কাছে পেয়ে পরিবারেরসহ গ্রামের মানুষজন আনন্দ প্রকাশ করেন। জাহালমকে এক নজর দেখতে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবুরিয়া গ্রামে তাদের বাড়িতে ভিড় করেন এলাকাবাসী। তারা দুদকের ভুলে জাহালমের শাস্তির বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। এদিকে এ ঘটনা তদন্তে দুদকের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ সময় জাহালম সাংবাদিকদের বলেন, যারা তার জীবন থেকে তিনটি বছর কেড়ে নিয়েছে তাদের যেন সরকার আইনের আওতায় এনে বিচার করেন। তিনি বলেন, দুদক যেন সঠিক তদন্ত করে সঠিক অপরাধীকে ধরে। মিথ্যা মামলায় আমার মতো আর কাউকে যেন জেল খাটতে না হয়। বিনা অপরাধে জেল খাটছি এটা ভেবেই আমার বেশি কষ্ট হয়েছে। আমি যদি অপরাধী হতাম, যদি এ ব্যাপারে কিছু জানতাম তাহলে এত কষ্ট হতো না। এখন আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই। একইসঙ্গে ক্ষতিপূরণ চাই।
জাহালমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, এই তিন বছরে আমার ব্যাটারে আমি দেহি নাই। যার কারণে আমার ব্যাটা জেল খাটলো তার বিচার শেখের বেটি যেন করে, তার যেন জেল অয়।
জাহালমের বড় ভাই শাহানূর মিয়া বলেন, আমার ভাইয়ের কারাগারের তিনটি বছর কেউ ফিরিয়ে দিবে না। কিন্তু আমাদের পরিবার যে কারণে পথে বসেছে তার কি হবে! শাহানূর মিয়া সরকারের কাছে ন্যায় বিচার আশা করেন।
হাইকোর্টের আদেশে রবিবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম। বড় ভাই শাহানূরকে সাথে নিয়ে ভোরের দিকে গ্রামের বাড়ি পৌঁছান জাহালম। দীর্ঘদিন পর তাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা মনোয়ারা বেগম। ছুটে আসেন তার বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোনসহ প্রতিবেশিরা। এক সময় জাহালমকে দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে তোলা হয়।
জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার
দাবি টিআইবির
সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাত্ মামলায় বিনা অপরাধে তিন বছর কারাবাসের পর শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে পাটকল শ্রমিক জাহালম মুক্তি পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে জাহালমের জীবন থেকে মহামূল্যবান তিনটি বছর নষ্ট হওয়ায় অবিলম্বে তাকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরপরাধ জাহালমকে মুক্তির নির্দেশ এবং ভুল তদন্তে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে আদালত ন্যায়বিচারের গুরুতর বিচ্যুতির অবসান ঘটিয়েছেন। এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তদন্ত কমিটি গঠন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির ২৬টি মামলায় বিনা দোষে জাহালমের তিন বছর কারাভোগের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। গতকাল সোমবার দুপুরে দুদক কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এ সময় তিনি বলেন, জাহালমের ঘটনায় দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যদি কোনো গাফিলতি থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা জজ পদমর্যাদার দুদকের একজন পরিচালককে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, দুদকের আইন শাখার পরিচালক আবুল হাসনাত মো. আব্দুল ওয়াদুদকে দায়িত্ব দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কমিশন। তিনি জাহালমের ঘটনায় দায়িত্ব প্রাপ্ত নয় জন তদন্ত কর্মকর্তার কি কি অনিয়ম হয়েছে তা খুঁজে বের করবেন। তাছাড়া এসব মামলায় তদন্ত কর্মকর্তারা কোনো অনৈতিক কার্মকাণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসব করেছেন কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত করবে এ কমিটি।
এর আগে দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, জাহালমকে সালেক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্যাংক। পুলিশও আসামি হিসেবে জাহালমকে সালেক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এনআইডি কর্তৃপক্ষও একই ভুল করেছে। এটা দুঃখজনক। তাই কোথায় আসলে ভুল হয়েছে, সেটাই খতিয়ে দেখা হবে।
উল্লেখ্য, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ২৬টি মামলায় তাকে বিনাদোষে কারাভোগ করতে হয়। পরে হাইকোর্ট রবিবার জাহালমকে একদিনের মধ্যেই অব্যাহতি দিয়ে মুক্তির নির্দেশ দেয়। এরপর জাহালম রাতেই গাজীপুরের কাশিমপুরের কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে মুক্তি পান।
