মেসির স্বপ্ন পূরণ

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ২২:১৯

মারাকানায় কোপার ফাইনালের রেশ তখনো টগবগ করে ফুটছে। একদিকে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের উল্লাস চলছে। অন্যদিকে ফাইনালে হেরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা হতাশায় ডুবছে। মারাকানার মাঠে চোখের পানি ঝরল। মেসির চেয়ে পাঁচ বছরের জুনিয়র নেইমার ও তার সঙ্গীরা কাঁদলেন ট্রফি জিততে না পেরে। মেসিরা কাঁদলেন ট্রফি জয়ের আনন্দে। যে মাঠ থেকে মেসিরা হতাশা নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন, সেই মাঠেই নেইমারদের হারিয়ে  আর্জেন্টাইনদের আক্ষেপ, কষ্ট ও না-পাওয়ার বেদনা মুছে গেছে। মেসির আনন্দাশ্রু যেমন তার কোটি ভক্তের চোখের কোনা ভিজিয়েছে, তেমনি নেইমারের কান্না ফুটবল-ভক্তদের কাঁদিয়েছে। নেইমার কতটা অসহায় হয়ে পাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন! তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন তার দলের খেলোয়াড়রা। নেইমারকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন বন্ধু মেসি। আর ছবিটি ধরে রাখতে জ্বলে উঠল ক্যামেরার ফ্লাশ। মেসি-নেইমার একসঙ্গে বসে কথাও বলেছেন। পাওয়া না-পাওয়ার আনন্দ-বেদনা ভুলে একসঙ্গে গল্পও করেছেন দুজনে। অন্যদিকে আর না-পারার ব্যর্থতার দায় নিয়ে ব্রাজিল কোচ তিতে ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন টিভি ক্যামেরার সামনে।

কোটি কোটি ফুটবল-ভক্ত টিভির পর্দায় চোখ রাখলেন। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ধ্রুপদি ফুটবলের সৌন্দর্যে মোহিত হবেন দর্শক। কত বছর পরপর এমন হূদয়-নিংড়ানো ফুটবল লড়াই দেখার সুযোগ হয়। ফুটবল দুনিয়াকে তোলপাড় করে দেওয়া এমন ম্যাচ চাইলেই তো পাওয়া যায় না। সুযোগ কে মিস করতে চায়! কিন্তু কোপার ফাইনালে ধ্রুপদি লড়াইয়ের ছন্দপতনই হয়েছে। মারাকানার মাঠে যাদের ঝংকারে রক্তে নাচন ওঠার কথা সেই ফুটবলারদের লড়াইয়ে সৌন্দর্যের বদলে ঘুরেফিরে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলের ছবিটাই চোখে পড়ল।

১৯৯৩ সালে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার আর্জেন্টিনা কোপায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইকুয়েডরকে হারিয়ে। এরপর কাল আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল। মারাকানায় নেইমারদের মাঠে নেইমারদের ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো। আরেকটি মারাকানা ট্র্যাজেডির সাক্ষী হলো ফুটবল দুনিয়া।

শৈল্পিক লড়াইয়ের বদলে পাওয়ার ফুটবলের ম্যাচ যেন গোলাবারুদ ছোড়ার ম্যাচে পরিণত হয়েছিল। খেলার চেয়ে শরীরের ব্যবহার বেশি হয়েছে। ধাক্কাধাক্কি, টেনে ফেলে দেওয়া চোখে পড়েছে। আর্জেন্টিনার ফুটবলারের পায়ে ঝরেছে রক্ত। নেইমারের প্যান্ট ছিঁড়ে গিয়েছে। দুই দলের ফাউল হয়েছে ৪১টি।

২১ মিনিটে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার চোখ-ধাঁধানো গোল শুধু আর্জেন্টিনার অপেক্ষার অবসান ঘটায়নি, সেই সঙ্গে মেসির স্বপ্ন পূরণও করেছে। যার হাত ধরে আর্জেন্টিনা কোপা পেয়েছে, সেই মেসি কোপার সব কটি ম্যাচ খেলেছেন। ৪ গোল করেছেন এবং ৫ গোল করিয়েছেন। ফাইনালে অল্পের জন্য গোল পাননি। আফসোস নেই। কোপায় ১২ গোলের সবগুলোতে মেসির অবদান আছে। টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল সব পুরস্কার পকেটে করে বাড়ি নিয়ে গেছেন মেসি। এমন স্মরণীয় মুহূর্তে মাঠে বসেই তিন সন্তানের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছেন তিনি।

মেসির এই সাফল্যের পেছনে গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকিংয়ে সেমিফাইনালে তিনটি শট ঠেকিয়ে ফাইনালে ওঠার পথ তৈরি করেছিলেন। কাল ব্রাজিলের রিচার্লসনের নিশ্চিত গোলও বাঁচিয়েছেন মার্টিনেজ। সবাই মেসিকে কাঁধে তুললেন আর মেসি তুললেন গোলকিপার মার্টিনেজকে। ৭ হাজার ৮০০ দর্শকের সঙ্গে দুর্লভ এই মুহূর্তগুলো দেখলেন ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনি।