এক জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট থাকলে মাসে শতাধিক সিজারিয়ান সম্ভব

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ২২:২৩

দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিত্সা সেবার যে করুণ অবস্থা তার একটি হলো গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। গতকাল ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সরেজমিনে গিয়ে এই হাসপাতালে চিকিত্সা সেবার চরম অব্যবস্থাপনা চিত্র দেখা গেছে। জনবল সংকটে অপারেশন বন্ধ। এমনকি সিজারিয়ান অপারেশন হয় না। মাঝে মাঝে দুই একটি জরুরি সিরাজিয়ান করা হয় অন্যত্র থেকে এনেসথেসিয়া এনে। অন্য কোন অপারেশন করা সম্ভব হয় না। টেকনিশয়ান না থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি তালাবদ্ধ থাকে বেশিরভাগ সময়। হাসপাতালের অভন্তরে সর্বত্রই নোংরা ও ময়লা-আবর্জনা। কর্মরত চিকিত্সকরা বলেন, জনবল সংকটের কারণে কালিয়াকৈর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে সদিচ্চা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের আমরা চিকিত্সা সেবা দিতে পারছি না। পরিস্থিতি এমন যে,   হাত-পা বেঁধে আমাদের বলে সাঁতার কাটো। এই অবস্থা হলো এই হাসপাতালের চিকিত্সা সেবার। নির্ধারিত পদে জনবল থাকলে পুরো উপজেলার করোনাসহ সার্বিক চিকিত্সা সেবার আমূল পরিবর্তন হয়ে যেতো। কালিয়াকৈর এর মানুষ পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সেবা পেতো। এই হাসপাতালে এনেসথেসিয়া ডাক্তার নেই। অথচ শুধুমাত্র একজন এনেসথেসিয়া ডাক্তার থাকলে মাসে শতাধিক সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্ভব হতো। সেবা না পেয়ে রোগী বেসরকারি ক্লিনিকে যাচ্ছে। সেখানে সিজারিয়ান অপারেশন করতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই সুযোগ নিচ্ছে দালালরা। তারা আগত রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায় স্থানীয় ক্লিনিকে। দরিদ্র রোগীরা এই চিকিত্সা সেবার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে হচ্ছেন সর্বশান্ত। 

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, একটি উপজেলায় চিকিত্সা সেবার সার্বিক অবকাঠামো আছে। শুধুমাত্র জনবল সংকটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ওয়ার্ড পর্যায়ে হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সেবা পাচ্ছে না মানুষ। অথচ এগুলো সচল থাকলে দেশে করোনার চিকিত্সার এই দূরবস্থার সৃষ্টি হতো না।

টাঙ্গাইল হাইওয়ে রোডের পাশেই কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অবস্থিত। এই উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাস। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই হাসপাতালে ৫ জন কনসালটেন্ট পদের মধ্যে মাত্র দুই জন কনসালটেন্ট আছেন। একজন শিশু কনসালটেন্ট, অন্যজন গাইনি কনসালটেন্ট। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ৩০টি পদে জনবল নেই। নাইট গার্ড নেই। দুই জন মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে হাসপাতালটি চলছে। আরএমও টিএইচও প্রশাসনিক পদ। এই উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। তবে ৫টি স্থাপনাও নেই, কার্যক্রম নেই। ওই সব ইউনিয়নের মানুষ চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত। জনবল সংকটের কারণে রোগীরা সেবা পান  না। এই উপজেলার ওয়ার্ড পর্যায়ে ৩৬টি হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। এই উপজেলায় করোনা আক্রান্তের হার ৩০ ভাগ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশন বেড আছে ৬টি। গতকাল দুই জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এছাড়া করোনা রোগীদের জন্য ১০টি বেড আছে, সেখানে গতকাল গিয়ে দেখা যায়, ৫ জন রোগী ভর্তি আছেন। সেন্ট্রাল অক্সিজেন চালু নেই। সিলিন্ডার অক্সিজেন দিয়ে কোন রকমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সীমিত।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই জন ডাক্তার জয়েন্ট করার পর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছে। আর কোন দিন আসেননি। ১৩ জন ডাক্তারের পদ শূণ্য। তিন জন ডাক্তার প্রেষণে ঢাকায় আছেন। যোগদানের পর থেকে কমপেক্ষে দুই থেকে তিন বছর কর্মস্থলে চিকিত্সকদের থাকার নিয়ম রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বদলি কিংবা প্রেষণে রাজধানীতে পাঠানো যাবে না। কিন্তু এই নিয়ম উপেক্ষা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এই ধরনের বদলি কিংবা প্রেষণে চিকিত্সকদের পছন্দের জায়গায় প্রেরণের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এর পেছনে রয়েছে ঘুষ আর তদ্বির। হেলথ কমপ্লেক্সে রোগীরা ঠিকমতো ওষুধ পান না। শুধুমাত্র দুই তিন ধরনের ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয়। অথচ ৪০ থেকে ৫০ ধরনের ওষুধ সরকার থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অভিযোগ আছে ওষুধ পাচার হয়ে যায়। তবে চিকিত্সকরা ওষুধ পাচারের বিষয়টি অস্বীকার করেন। বাইরে থেকে হাসপাতালটি সুন্দর দেখা যায়। কিন্তু ভিতরে চারদিকে ময়লা-আবর্জনা। জরুরি বিভাগেও ময়লা রাখা হয়। ওয়ার্ডগুলোতে নোংরা ও ময়লা। জরুরি বিভাগে ছিলেন একজন উপ স্বাস্থ্য কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ও একজন ওয়ার্ডবয়। এরাই ইমার্জেন্সি চালান। খাবারের মান নিম্নমানের বলে রোগীরা অভিযোগ করেন।

কর্তব্যরত দুই জন ডাক্তার এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে বলেন, হাসপাতালের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু জনবলের অভাবে রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। তবে আমরা সাধ্যমতো সর্বাত্মক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।