‘গেম’ পর্যায়েই সাগরে ডুবে মরছে বাংলাদেশিরা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০০:৩৭

লোভনীয় চাকরির কথা বলে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে মানব পাচার করা হচ্ছে। ইউরোপে পাচার করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তিনটি ধাপ অনুসরণ করছে। ধাপের সর্বশেষ অংশটাই সবচেয়ে ভয়ংকর—নৌকায় করে সাগরপাড়ি। পাচারকারীরা একে সাংকেতিক নামে বলে ‘গেম’। এই গেম পর্যায়েই পাচারের শিকার বেশির ভাগ মানুষের সলিল সমাধি ঘটে সাগরে।

গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার মঈন আলী এসব তথ্য জানান।

খন্দকার মঈন আলী বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১০ ও ১১ জুলাই ভোর পর্যন্ত র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৮-এর যৌথ অভিযানে মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে প্রধান সমন্বয়কারী আশিক, আজিজুল হক, মিজানুর রহমান মিজান, নাজমুল হুদা, সিমা আক্তার, হেলেনা বেগম এবং পলি আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়।  এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৭টি পাসপোর্ট, ১৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, দুটি এটিএম কার্ড, ১৫টি বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার বই, দুটি হিসাব নথি উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতরা বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে ইউরোপে মানব পাচার করে আসছে। তারা মূলত তিনটি ধাপে মানুষ পাচার করে থাকে। প্রথমে নিজস্ব এজেন্ট দিয়ে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক লোকদের নির্বাচন করা হয়। এরপর তাদের লিবিয়া পাঠানো হয়। পরে লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে অবৈধভাবে সাগরপথে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নির্বাচনকালে এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়।  বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট কেনা ইত্যাদি কাজগুলো এ সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে। পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথিগুলো পাচারকারীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেয়।

র্যাবের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, পরবর্তী সময়ে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রে তারা ৭-৮ লাখ টাকার অধিক অর্থ নিয়ে থাকে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি আড়াই লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার পর স্বজনের কাছ থেকে নেয়। সিন্ডিকেটটি বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে লিবিয়ায় মানুষ পাঠাচ্ছে। তারপর পাঠানো হয় বেনগাজি, সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয় ত্রিপোলি।

কমান্ডার মঈন আলী বলেন, ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর লিবিয়ার এজেন্টদের সহায়তায় গাজী, কাজী ও বাবুল নামের তিন জন বাংলাদেশি তাদের গ্রহণ করে। এরপর বাংলাদেশিদের নেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট স্থানে। সেখানে পাচারকারীরা সমুদ্রপথ অতিক্রম করার জন্য নৌযান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া থেকে তিউনিশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। ভূমধ্যসাগরে নৌকায় ওঠাকে পাচারকারীরা নিজেদের মধ্যে ‘গেম’ বলে ডাকে। অর্থাত্ সেখানে ঝুঁকি আছে, আবার রয়েছে উন্নত জীবনের হাতছানি। কখনো উত্তাল সাগরে ডুবে আবার কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মারা যায় পাচারের শিকার বাংলাদেশিরা।

এ বিষয়গুলো সিন্ডিকেটের মূল হোতা রুবেল দুবাইতে বসে তত্ত্বাবধান করে। রুবেল ২০১২-২০১৭ সাল পর্যন্ত লিবিয়া ছিল। তখনই তিনি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মানব পাচারের ঘটনায় লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে রুবেলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।