ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ও ফুটবল উত্তেজনা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০০:৩৮

ইউরো কাপ নিয়ে বাংলাদেশে তেমন উত্তেজনা নেই। কিন্তু লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই কোপা আমেরিকার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। কারণ? ইউরো কাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নেই। কিন্তু কোপায় আছে। ফাইনালে নেইমার-মেসিদের মাঠের ফুটবলের লড়াইয়ের আগেই আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটেছে তুমুল মারামারির কাণ্ড। সেখানে আর্জেন্টিনার তিন সমর্থককে বেদম পিটুনি দিয়েছে ব্রাজিল সমর্থকরা। আহতদের জেলা সদর হাসপাতালে এনে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। একই দিনে একই এলাকার নওয়াব মিয়া নামে এক ব্রাজিল সমর্থককে পিটুনির জেরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ওপর পালটা আক্রমণ করা হয় বলে জানা গেছে।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলা হলো ব্রাজিলে। কিন্তু  খেলার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। কেউ কেউ প্রস্তাব করেছিলেন, সেখানে যেন কারফিউ দেওয়া হয়। তবে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাড়তি পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে। ফাইনালের আগে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার কোচের চেয়েও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসপির টেনশন ছিল বেশি! এই কঠোর লকডাউন ও করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির লগ্নে যদি বড় কোনো হাঙ্গামা বাধে, তাহলে তার দায় যে তার ওপরেই বর্তাবে!

আমরা খেলা নিয়ে যথেষ্ট বাড়াবাড়ি করি। কিন্তু স্বীকার করি না। বিশেষ করে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। এই দুই দলের সমর্থকরা ছাত্রলীগ আর কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মতো পারলে একে-অপরের হাড়-হাড্ডি গুঁড়ো করে  দেয়। কীভাবে অপরকে জব্দ করা যায়, অপমান করা যায়, তাতিয়ে দেওয়া যায়, সারাক্ষণ সেই চেষ্টা। এতে নির্মল আনন্দের চেয়ে তিক্ততা হয় বেশি—সে হুঁশ আমাদের থাকে না। সেদিকে আমরা খেয়ালও রাখি না। ‘সেভেন-আপ,’ ‘থ্রিপিস,’ ‘ডিমের হালি’, ‘কাকলি ক্লাব’—এসব উপমা কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিক্ততা, বিদ্বেষ এবং ঝগড়ার হাতিয়ার ছাড়া ফান-আইটেম কম হয়েছে।

আমরা আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো অন্ধ দলতন্ত্রে নিমজ্জিত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও। দলের কোনো দোষ বা ত্রুটিই কবুল করতে চাই না! হারলে বলি : ভাগ্য সহায় ছিল না, প্রতিপক্ষ ফাউল করে খেলেছে, রেফারি পারশিয়ালটি করেছে, অমুকের ইনজুরি ছিল। কিন্তু শেষ বিচারে খেলা তো গোলের এবং ফলের। পরিস্থিতি যা-ই হোক, ফলটাই তো পরের সবকিছু নির্ধারণ করে। আমরা নিজ দলের পক্ষে কখনো ‘ফল’ কখনো ‘শিল্প’পন্থি হয়ে যাই!

ফুটবল সমর্থন কি এমন অন্ধ দলবাজিতে পরিণত হওয়া উচিত? নাকি ‘ভালো খেলা’ বিবেচনায় হওয়া উচিত? বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার! ‘ব্রাজিল শৈল্পিক ফুটবলের সূতিকাগার, পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন; কাজেই আমি ব্রাজিল;’ ‘যে দলে ম্যারাডোনা খেলেছে, মেসি খেলে, আমি সেই আর্জেন্টিনার সমর্থক;’ ‘কিংবা জার্মানি মানেই জয়, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, কাজেই আমি জার্মানি’—এ ধরনের আপ্তবাক্য কি আমাদের বিশেষ ‘দলপন্থি’ বানিয়ে ফেলছে না? এর পর যা হচ্ছে, আমরা নিজ দলের সমালোচনা নিতে পারছি না, নিজের দলকে সারাক্ষণ শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করে প্রতিপক্ষের বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছি। কেউ দলের সমালোচনা করলে ‘হাতুড়ি’ নিয়ে তেড়ে যাচ্ছি! ফুটবল সমর্থন তো পিতৃ বা মাতৃপরিচয় নয়, যে মুছে ফেলা যায় না বা পরিবর্তন করা যায় না! এটা কোনো মহত্ আদর্শও নয়, শুধু একটা ক্ষণিক আনন্দের উপাদান, এই নিয়ে এমন উন্মত্ত আচরণ আমরা কেন প্রদর্শন করব? আমাদের স্থায়ী সমর্থন শুধু বাংলাদেশের বেলায় প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বাকি সব শর্তসাপেক্ষ, পরিবর্তন যোগ্য। এবার আমার কলম্বিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া বা ইংল্যান্ডের খেলা ভালো লাগতে পারে, আগামী বার হয়তো ব্রাজিল। তার পরের বার হয়তো আর্জেন্টিনা, ইতালি বা অন্য কেউ! কিন্তু আমরা সেটা না করে নির্দিষ্ট দু-তিনটি ফুটবল দলের সোল এজেন্ট হয়ে বসে আছি। যেন আমরা ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রদলের নেতা, ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্য না দেখালে, ‘দাসখত’ লিখে না দিলে পদ থাকবে না, উন্নতি হবে না! কেন আমাদের চিন্তায় সমর্থনে এই ‘দাসত্ব’ থাকবে?

সমাপ্তির হলো ইউরো আর কোপা আমেরিকা কাপ। বহু দিন পরে, মহামারি-লাঞ্ছিত সময়ে, আয়োজিত হলো এই বড় মাপের ক্রীড়ানুষ্ঠান। তা বহু খেলোয়াড়ের স্বপ্নপূরণ, বহু সমর্থকের উচ্ছ্বাসের কারণ, তাতে মেতেছেন সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে রাজনীতির রং লেগেছে। ইউক্রেন দলের জার্সিতে যে জাতীয় মানচিত্র আঁকা হয়েছে, তাতে উপস্থিত ক্রিমিয়া, যদিও ২০১৪ সালে এই অঞ্চলকে একীভূত করেছিল প্রতিবেশী রাশিয়া। অতএব দেশনায়কদের গৌরবে যে বন্দনা প্রকাশ করেছে ঐ জার্সি, তাকে ‘নািস রূপ’ বলে কটাক্ষ করেছে রাশিয়ার শাসকরা। অন্য দিকে, মিউনিখের একটি ম্যাচকে বৃহত্ বহুজাতিক গাড়ি নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কিছু স্বেচ্ছাসেবী। পরিকল্পনার বিভ্রাটে গোলযোগও হয়েছে। আর এক সংকটের সাক্ষী হয়েছে আজারবাইজানের বাকু স্টেডিয়াম। রামধনু পতাকাধারী দুই ব্যক্তিকে স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে নিয়ামক সংস্থা উয়েফা। তার পরেও ফুটবল থেকে রাজনীতিকে বিচ্যুত করা যায়নি। খেলা থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করা বুঝি এক কথায় অসম্ভব।

ল্যাটিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। এই দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে রেষারেষি আছে। ১৮২৫ সালে সিসপ্ল্যাটাইন ভূখণ্ড নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেতেছিল দুই দেশ। প্রায় তিন বছর তাণ্ডবের পর ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যস্থতায় রণাঙ্গন ছেড়েছিল তারা। যুদ্ধ থামলেও কমেনি উত্তেজনা। যার স্পষ্ট প্রভাব পড়ে ফুটবল মাঠেও। ১৯২৫ সালের কোপার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে দুই দলের ফুটবলাররা, দর্শকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। ড্র হওয়া সেই ম্যাচের পর ১১ বছর দেখা হয়নি আকাশি-নীল ও হলুদ জার্সিধারীদের। ১২ বছর পর ফাইনালে আবার দেখা। আর্জেন্টাইনদের মাঠে বিতর্কিত গোল আর বর্ণবাদী আচরণে শেষ বাঁশি বাজার আগেই মাঠ ছাড়ে সেলেসাওরা। ব্রাজিলের মিডিয়া বলেছে, এটি ছিল লজ্জার ম্যাচ।

এর ঠিক দুই বছর পর আবারও বিতর্ক। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে শেষ সময়ে পেনাল্টির বাঁশি বাজায় রেফারি। সে সিদ্ধান্ত পছন্দ না হওয়ায় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যায় আর্জেন্টিনার পুরো দল। খালি পোস্টে স্পটকিক নিয়ে ম্যাচ জেতে সেলেসাওরা। সেই ঐতিহাসিক বিরোধ আর উত্তেজনার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। তবে সেটা ব্রাজিল-আর্জেন্টাির গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে ঠেকেছে। ফুটবলের জাদু বুঝি একেই বলে !

একসময় দেশে বর্ণবিদ্বেষের প্রথা চালু রাখবার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়াঙ্গনে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই দেশের সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের পেছনে যে ঘটনার তাত্পর্য স্বীকৃত। অষ্টাদশ শতকের হাইতি বিদ্রোহ এবং গ্যারি সোবার্সের ক্রিকেট খেলাকে চলমান বিপ্লবের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেন ইতিহাসবিদ সি এল আর জেমস। কখনো শ্বেতাঙ্গ সতীর্থদের মধ্যে একাকিত্বের বেদনার কাহিনি শুনিয়েছেন ক্রিকেটার মাখায়া এনটিনি, কখনো ফুটবলার থিয়েরি অঁরি শুনিয়েছেন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রশিক্ষক পদ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা। খেলা রাজনীতিকে প্রভাবিত করিবে—এটাই বাস্তব। এটি বহু জনের পরিচিতির প্রশ্ন; কারো আত্মাভিমান, কারো অস্তিত্ব। এটি জাতি-রাষ্ট্রগুলোর ভেতর দ্বৈরথের প্রতিচ্ছবি, অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের দর্পণও। সুতরাং, ইউরো কাপে ফ্রান্স-জার্মানি কিংবা ইতালি-ইংল্যান্ডের ম্যাচ কেবল ৯০ বা ১২০ মিনিটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপের মহাশক্তির ক্ষমতার ভারসাম্যের নির্ধারকও।

খেলা এখন বিনোদনের পাশাপাশি বাণিজ্যেরও একটি বড় উপাদান। অর্থনীতি বা বাণিজ্যের প্রসঙ্গটিও খেলার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একেকটি দেশের অর্থনীতির পক্ষে বড় ভরসা হয়ে ওঠে একেকটি বড় টুর্নামেন্ট। খেলোয়াড়দের শরীরে আঁকা উল্কি, তাদের দাম থেকে গ্যালারির সজ্জা—সবই বহুলাংশে নির্ধারণ করে বাণিজ্য। সম্প্রতি যে অভিজাত ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’-এর পরিকল্পনা সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে আলোড়িত করেছিল, তার পেছনেও চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যিক লাভক্ষতির অঙ্ক। ক্রীড়ার সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গনগুলোই নানাভাবে প্রমাণ করে দেয় দেয়, তা রাজনীতি ও অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ, আবার সমাজের অনুরণনেই তার প্রাণশক্তি।

তবে তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশের দর্শক হিসেবে আমাদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে মারামারি বা সংঘর্ষে জড়ানোর কোনো মানে নেই। আমরা খেলা দেখব স্রেফ বিনোদন হিসেবে। আপাতত আমাদের করোনা থেকে রেহাই পাওয়ার পথ-পদ্ধতির অন্বেষণ ছাড়া অন্য কিছু করার বা ভাবার সুযোগ নেই।

n লেখক :রম্যরচয়িতা