বর্তমান সময়ে ব্যবসায়িক সফলতা নির্ভর করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং পলিসির ওপর। আমরা যদি বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে—তারা আজ এই অবস্থানে এসেছে তাদের ইউনিক মার্কেটিং স্ট্রাটেজি দিয়ে। যুগোপযোগী মার্কেটিং পলিসি ছাড়া তীব্র প্রতিযোগিতায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব না।
কার্যকর মার্কেটিং পলিসি তৈরির জন্য প্রয়োজন সুদক্ষ, সৃষ্টিশীল, দূরদর্শী মার্কেটারের। পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে ছোটখাটো একটি ভুলও অনেক সময় ব্যবসাকে পথে বসাতে পারে। মার্কেটারদের দূরদর্শিতার অভাব এবং ভুল ডিসিশন মেকিং অনেক ফেমাস কোম্পানিকেও দেউলিয়া করেছে। মার্কেটিং পলিসি মেকিংয়ে মার্কেটাররা অনেক ভুল করে থাকে আর তাদের সবচেয়ে বড় ভুল হল—‘মার্কেটিং মাইওপিয়া’। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে থিওডোর লেভিটের একটি নিবন্ধে তিনি প্রথম ‘মার্কেটিং মাইওপিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মাইওপিয়া মূলত একটি চোখের রোগ। মাইওপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টি আক্রান্ত চোখ খুব কাছের বস্তু বেশ ভালো দেখলেও দূরের বস্তু ঝাপসা দেখে। মার্কেটিং মাইওপিয়া বলতে ঐ অবস্থাকে বুঝায় যখন কোনো কোম্পানি মনে করে তারা সবসময় সঠিক। তাদের পণ্য সেরা এবং বাজারে অনেক সময় ধরে টিকে থাকবে। তাদের সমকক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। বাজারে থাকা কোম্পানিগুলোকে তারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে চায় না। মার্কেটিং মতবাদের মূল লক্ষ্য হলো—ক্রেতাসন্তুষ্টির মাধ্যমে ক্রেতার প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণ। ক্রেতাসন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে প্রথমে ক্রেতার প্রয়োজন, চাহিদা সম্পর্কে বুঝতে হবে; কিন্তু মার্কেটিং মাইওপিয়ায় কোম্পানি সবসময় নিজের লাভের কথা ভাবে। ক্রেতাদের প্রয়োজন চাহিদা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই তারা মানসম্মত পণ্য বাজারে আনলেও তা ক্রেতাসন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হয় না। কারণ তাদের পণ্য ক্রেতার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়।
নোকিয়া হলো মার্কেটিং মাইওপিয়ার সর্বোত্কৃষ্ট উদাহরণ। ২০১১ সাল পর্যন্ত নোকিয়া ছিল বিশ্বের সর্ববৃহত্ মোবাইল ফোন উত্পাদনকারী কোম্পানি। এত সফলতার পরেও ২০১২ সাল থেকে নোকিয়ার পতন শুরু হয় এবং শেয়ারমূল্য দাঁড়ায় মাত্র দুই ডলারে। বর্তমানে নোকিয়ার ১ শতাংশ শেয়ার বাজারে আছে। নোকিয়ার উত্থান-পতন বিষয়টি খেয়াল করলে আমরা মার্কেটিং মাইওপিয়া বিষয়টি বুঝতে পারব। কেন নোকিয়ার এত পতন? অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম যখন বাজারে আসে তখন তারা নোকিয়াকে তাদের সঙ্গে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেয়; কিন্তু নোকিয়া অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম না দেখেই সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। তখন নোকিয়ার অপারেটিং সিস্টেম ছিল ‘সিম্বিয়ান’ যা আপগ্রেড করা ছিল ভীষণ কষ্টসাধ্য এবং সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। নোকিয়ার ফোনের অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট করাটা ছিল কষ্টসাধ্য। যার কারণে নোকিয়ার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে এবং তাদের কাস্টমাররা অন্য ফোনের দিকে ঝুঁকতে থাকে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ভোক্তার প্রয়োজন এবং চাহিদা উপলব্ধি করা এবং সে চাহিদা মোতাবেক পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আর প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে এক ধাপ এগিয়ে থাকার জন্য প্রয়োজন কার্যকরী বাজার গবেষণা। পণ্য যত ভালো মানের হোক যদি তা ভোক্তার চাহিদা পূরণ করতে না পারে তাহলে সেটি বাজারে টিকবে না। মার্কেটিংয়ের সব কার্যক্রম হবে ভোক্তাকে কেন্দ্র করে, কারণ মার্কেটিং মতবাদে ভোক্তাই রাজা।
কোমল পানীয় হিসেবে আমরা কোকা-কোলার নাম শুনিনি বা খাইনি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। ১৮৮৬ সালে যাত্রা শুরু করা পাঁচ সেন্ট প্রতি গ্লাস কোমল পানীয়র প্রথম বছর বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৯ গ্লাস। কোকা-কোলার বর্তমানে ২০০টিরও অধিক দেশ বা অঞ্চলে ৫০০টিরও অধিক ব্র্যান্ড রয়েছে। কোকা-কোলা ভোক্তার কথা চিন্তা করে একটি ফ্লেভারে বসে থাকেনি বাজারে ছেড়েছে বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়। স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের জন্য এনেছে ডায়েট কোক। এছাড়াও স্প্রাইট, ফান্টার মতো কোমল পানীয়গুলো কোকা-কোলা কোম্পানির তৈরি।
প্রতিটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই ভোক্তাদের চাহিদাকে ছোট করে দেখা যাবে না। বিক্রি যত ভালো থাকুক, কোম্পানি যতই ভালো অবস্থানে থাকুক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবসময় নিজেকে আপডেট করে যেতেই হবে। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিজেকে এক ধাপ এগিয়ে রাখতে হবে। নিত্যনতুন ভোক্তার চাহিদা পূরণে সক্ষম পণ্য দিয়ে ভোক্তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
