সিপিডি-এফইএসের সংলাপে বক্তারা

কারখানার নিরাপত্তা শুধু তৈরি পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০০:৪৬

নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে :অধ্যাপক রেহমান সোবহান

ইত্তেফাক রিপোর্ট

তৈরি পোশাকশিল্প কারখানায় নিরাপত্তার উন্নতি হলেও সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অন্য কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ইস্যুটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। দেশে রানা প্লাজা ও তাজরীনের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর নীতিনির্ধারকরা শুধু গার্মেন্টশিল্প কারখানায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ৫৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দুর্বল তদারকি আর নিরাপত্তার অবহেলার চিত্র উঠে এসেছে।

অ্যাকর্ড-এলায়েন্স-পরবর্তী সময়ে গার্মেন্ট কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বিষয়ে গতকাল ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। এই সংলাপের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ফ্রিডরিচ-এবার্ট-স্টিফটং (এফইএস) বাংলাদেশ। এতে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

আলোচনায় অতিথি ছিলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) মহাপরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. ফারুক হাসান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মো. হাতেম, ডাইফের আরসিসি প্রকল্পের পরিচালক এ কে এম সালেহউদ্দিন। এতে শ্রমকি নেতা বাবুল আক্তার, কল্পনা আক্তার, চায়না রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন। সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী সংলাপটি সঞ্চালনা করেন।

সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, বায়ার এবং দাতাদের চাপের কারণে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ শুধু তৈরি পোশাকশিল্প কারখানাকে কেন্দ্র করে। নিরাপত্তার বিষয়টি তৈরি পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করেই আলোচিত হচ্ছে। অথচ এই সমস্যা সারা দেশের অন্য কারখানাগুলোতেও রয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প কারখানায় উন্নতি হলেও অন্য কারখানার নিরাপত্তা ইস্যুটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এজন্য দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। কারখানার নিরাপত্তা ইস্যুতে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেটি এখন অনেকটা অনীহায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) কাজে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তারা কারখানা মালিক দ্বারা প্রভাবিত। এ ধরনের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিজিএমই সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, কারখানার নিরাপত্তা মান নিয়ে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয় সেখানে মালিকপক্ষের কথা বলার সুযোগ নেই। কারখানাগুলোর নিরাপত্তার অনেক উন্নতি হয়েছে এবং আরো বহু কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

চায়না রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে সেজান জুস ফ্যাক্টরির দুর্ঘটনার জন্য সস্পূর্ণভাবে দায়ী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। সেখানে নিরাপত্তা বলে কিছুই ছিল না। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে অধিদপ্তরের জনবলসংকটসহ নানা দুর্বলতার কথা শুনেছি, এখন এতবছর পরেও শুনছি। প্রকৃতপক্ষে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর মালিকদের সুরেই কথা বলে।

মো. হাতেম বলেন, রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে, আমরা শুধু তৈরি পোশাক কারখানা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। অন্য কারখানার নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করতে হবে। গার্মেন্টস কারখানার বাইরে অন্য কারখানাগুলোতে বেশির ভাগই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। মূল প্রতিবেদনে গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্প কারখানাগুলোর নিরাপত্তা তদারকিতে গঠিত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কার্যক্রম শেষে নিরাপত্তা টেকসই করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগগুলোর বিশ্লেষণ করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত কারখানায় দুর্ঘটনার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, মাঝারি শিল্পে তুলনামূলক আগুন লাগার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা গেছে। কারখানার নিরাপত্তার তদারকি বাড়ানোসহ উদ্যোগগুলো টেকসই করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মুল উপস্থাপনায় তিনি আরো উল্লেখ করেন, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রফতানিমুখী পোশাক খাতের ২২২টি কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর প্রায় ৬৬ শতাংশই রপ্তানিমুখী। এমনকি ২০১৯ সালের তুলনায় গতবছর ২৪ শতাংশ বেড়েছে শ্রমিক হতাহতের সংখ্যা। তিনি বলেন, কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা ইস্যুতে সার্বজনীন নিয়ম বেধেঁ না দেওয়ার কারণেই ঘটছে একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটে। অ্যালায়ান্সে থেকে ৭১৪ টি কারখানা ও অ্যাকর্ড থেকে ১৬০০টি কারখানার সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিলো সেখানে বিদ্যুত্ এবং আগুন সংশ্লিষ্ট সমস্যা প্রায় ৯৮ ভাগ সমাধান করা গেছে তবে এখনো ৩২ শতাংশ কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান থাকায় দূর্ঘটনা ঘটছে।