রপ্তানি বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কারের তাগিদ

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ০০:৪৭

ঢাকা চেম্বারের ওয়েবিনার

ইত্তেফাক রিপোর্ট

দেশের রপ্তানি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিস) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে যে ধাক্কা আসবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সহায়তায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নির্ধারণ : প্রেক্ষিত নীতিমালা সংস্কার’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল  হোসেন মিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। 

স্বাগত বক্তব্যে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ এইচ এম আহসান বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা) কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবে তা মোকাবিলায় রপ্তানির দক্ষতা বাড়ানো ও বহুমুখীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি মার্কিন ডলার (৩ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা), যেখানে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৮১ শতাংশ। তবে বিগত বছরে মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ৮৪ শতাংশ, এ থেকে বোঝা যায়, তৈরি পোশাক খাতের বাইরের সম্ভাবনাময় খাতসমূহ এগিয়ে এসেছে। সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আরো এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, হালকা প্রকৌশল, পাট ও পাটজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সেবা, ওষুধ, কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চমড়া ও চামড়াজাত পণ্য প্রভৃতি পণ্যের বৈদেশিক রপ্তানি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সহায়ক নীতিমালা, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রাপ্তি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক হ্রাস, নন-ট্যারিফ প্রতিবন্ধকতা নিরসন, কাস্টমস ও টেস্টিং-এ দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করা প্রয়োজন। এপিআই শিল্প পার্কের কাজ দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। বেকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়ন, কৃষিকাজে উত্পাদনশীলতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দরকষাকষিতে দক্ষতা উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মতপ্রকাশ করেন।

 প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, হালকা প্রকৌশল, পাট প্রভৃতি খাতকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের বৃহত্ একটি অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে এবং সেখানে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোরারোপ করেন। ইউরোপের বাজারের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারগুলোর প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান দুলাল কৃষ্ণ সাহা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (কর নীতি) মো. আলমগীর হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অতিরিক্ত সচিব মো. বেলায়েত হোসেন তালুকদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাইক্রো ফিন্যান্স) ড. মো. খাইরুজ্জামান মজুমদার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স উইং) আন্দালিব ইলিয়াস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এক্সপোর্ট-২) মো. আব্দুর রহিম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) পরিচালক (রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ইনসেনটিভ-১) মো. আরিফুল হক এবং সানেমর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী সময়ে আমাদের রপ্তানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বাণিজ্য বাড়াতে বিভিন্ন আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তিনি করপোরেট করের হার কমানো প্রয়োজন বলে মতপ্রকাশ করেন। সানেমর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, এলডিসি উত্তরণ সময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য যথাযথ হোমওয়ার্ক করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নেগোশিয়েশনের দক্ষতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, রপ্তানি বিষয়ক নীতিমালায় যে ধরনের সংস্কার হয়, তা বাস্তবক্ষেত্রে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বৃহত্ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাতভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নে আরো বেশি হারে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন বলে মতপ্রকাশ করেন।