জানা-অজানা

স্টকহোম সিনড্রোম

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ২০:২৩

বলা হয়ে থাকে মানুষ এ ধরণীর সবচেয়ে বিচিত্র প্রাণী। বাহ্যিক আচরণের ভিন্নতার চেয়ে মানুষভেদে মানসিক অবস্থার বৈচিত্র সবচেয়ে বেশী। তেমন-ই একটি মানসিক বৈচিত্রতা হলো স্টকহোম সিনড্রোম। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যাতে পণবন্দী ব্যক্তিদের মনের মধ্যে তাদের অপহরণকারীদের প্রতি আনুগত্য ও আবেগপ্রবণ টান অনুভূত হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার রেশ পণবন্দীর মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে এবং এটি দিন, সপ্তাহ, মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরে বন্দী বা নির্যাতনের পরেও বিকাশ লাভ করতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষ তাদের বিপজ্জ্বনক পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কোনো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাহায্য করতে আসলে, উল্টো তাদের উপরেই বিরক্তি প্রকাশ করতে পারে অপহূত ব্যক্তিরা।

যেমনটি ঘটেছিলো ২০০২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করার মধ্যে দিয়ে। প্রায় দুই বছর পর অপহরণকারীর বাড়ী থেকে যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তখন দেখা যায় অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো।

মনস্তাত্ত্বিক এ ধারণাটি প্রথম বিকাশ লাভ করে ১৯৭৩ সালের ২৩ শে আগস্টের সকালে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনার জের ধরে। এই ব্যাংক ডাকাতির সময় ছয় দিন ধরে জিম্মি হয়ে থাকা চারজন ব্যাংক কর্মকর্তা তাদের আটককারী ডাকাতদের প্রতি দূর্বলতা প্রকাশ করেছিল।

এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট যখন তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তখন তাদের মুক্ত করার পাশাপাশি ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আর্জি জানিয়েছিলেন অপহূত ব্যক্তিরা। পরবর্তীতে বেতারে প্রচারিত সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানে একই রকম সাফাই গেয়েছিলেন এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা ক্রিস্টিন এনমার্ক। এমন ঘটনার পর থেকেই বিকশিত হয় স্টকহোম সিনড্রোম ধারণাটি।

তবে এই টান যে শুধুমাত্র পণবন্দী ব্যক্তিদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় তা কিন্ত নয়। একই অবস্থা ঘটতে পারে শিশু নির্যাতন, স্ত্রী নির্যাতন, এমনকি ধর্ষণের মতো ঘটনার ক্ষেত্রেও। যেমন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে ব্যাপক নির্যাতনের পর তার প্রতিবেশী বা বাপের বাড়ীর লোকেজন মামলা করলে, এই উপসর্গের কারনে আদালতে স্ত্রীকে দেখা যায় নির্যাতনকারী স্বামীর পক্ষেই অবস্থান নিতে।  এ উপসর্গ দেখানো মানুষেরা জীবনে যে শুধুমাত্র একবার, এক ব্যক্তি, একটি ঘটনায়, স্বল্প সময়ের জন্যে প্রভাবিত হয় অথবা একপাক্ষিক টানের কারনে ক্ষণিক বন্ধনে আবদ্ধ হয় তা কিন্ত নয়।

অস্ট্রিয়ায় তত্কালীন ত্রাস সৃষ্টিকারী ডাকাতদল ‘উলফগ্যাং প্রিকলোপিল‘ এর দ্বারা অপহূত হওয়ার প্রায় আট বছর পর নাতাশা ক্যাম্পুশ নামক জনৈক ব্যক্তি পালিয়ে নিজ বাড়ীতে ফেরেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, পালানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাতাশাকে জিম্মায় রাখা অপহরণকারী চলন্ত রেলের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

অন্যদিকে নাতাশাও তার অপহরণকারীর মৃত্যুশোকে কাতর হয়ে পড়েন। তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে তার ঐ অপহরণকারী ব্যক্তিটি ছিলো আপাদমস্তক একজন দুঃখী মানুষ। তাকে ছেড়ে আসার কারন ঐ ব্যক্তি ছিলোনা, ছিলো তার পেশা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি।

দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ধর্মীয় কারণে আটক রাখা বা যুদ্ধবন্দি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, নিকটাত্মীয় দ্বারা ধর্ষণের স্বীকার, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিসত্ত্বা ধ্বংসকারী কাজে জড়িত থাকা অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেই স্টকহোম সিনড্রোমের লক্ষণগুলো বেশী প্রতীয়মান হয় বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা।

যদিও অনেক গবেষক, মনোবিজ্ঞানী এবং ক্রিমিনোলজিস্ট স্টকহোম সিন্ড্রোমের অস্তিস্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এর পেছনে যথাযথ কারন অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়েছেন, তবুও তারা এবিষয়ে বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারনের অবতারণা করেছেন।

বন্দিদশায় অপহূত ব্যক্তিদের মনে এমন ভাবনার উদ্রেক হওয়া যে আইন প্রয়োগকারী কর্মীরা তাদের উদ্ধারকাজে যথেষ্ঠ তত্পরতা চালাচ্ছে না। আবার এর বিপরীতে অপহরণকারীরা তাদের সাথে মানবিক আচরণ করছে। এমন মুখোমুখি ইন্টারঅ্যাকশনের কারনেই স্টকহোম সিন্ড্রোম বিকশিত হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শাহাদাত সুমন