আমাদের সংবিধানে লেখা আছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ; কিন্তু এখানে আমলাতন্ত্রের বিষয়টি নানাভাবে নানান সময়ে আলোচনায় এসেছে। প্রজাতন্ত্রের মালিক যদি জনগণই হয়ে থাকেন তাহলে আমলারা জনগণকে যেভাবে আমলে নেওয়ার কথা সেভাবে নেন না কেন? আমলাতন্ত্র ও বৈষম্য আমাদের সমাজের জন্য বিশেষ করে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বড় এক সমস্যা হিসেবে জিইয়ে আছে। আমলাতন্ত্র সমাজে যেমন অনেক ক্ষেত্রেই বড় রকমের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে, তেমনি বৈষম্যও সমাজে বিভাজনের দাগ ক্রমেই মোটা করে চলেছে। আমলার গতি আমলাতন্ত্রের দিকে। এ কেবল তত্ত্বের কথা নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয়ও বটে। একজন কবিকে জানতাম যিনি ঠিক আমলা নন, তবে একটি সরকারি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। একদা আমি গেছি তার কাছে লেখা নিয়ে, দেখি একজন কাব্যযশো প্রার্থীকে তিনি বিদায় করছেন প্রাণপণে। কাব্যযশো প্রার্থীরা অনেক সময়েই মরিয়া হয়ে থাকেন, ঐ প্রার্থীকেও তেমনই মনে হলো। কিছুতেই শুনবেন না। কোথায় তার কাব্যের ত্রুটি তা তিনি জানতে চান, যেন জানার তার অধিকার রয়েছে, হাজার হোক সরকারি পত্রিকা তো বটে। নিরূপায় কবি-সম্পাদক দেখি শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করে বললেন, সরকার কাব্যযশো প্রার্থীর ঐ কবিতাটি পছন্দ করছে না। ঐ দৃশ্য আমি এখনো ভুলিনি। আমার ভীষণ হাসি পেয়েছিল; কিন্তু দেখি সম্পাদক মোটেই হাসছেন না, অত্যন্ত গম্ভীর একজন আমলা হয়ে গেছেন, নির্বিকার, নৈর্ব্যক্তিক মুখচ্ছবি হয়ে বসে আছেন খ্যাতিলোভী তরুণ কবিটির সামনে, মুখোমুখি।
না, হাসতে নেই, আমলাতন্ত্রে হাস্যরসের কোনো স্থান নেই। হাসলে সব কিছু ভেঙে পড়বে আর জোড়া লাগানো যাবে না, সবটাই হাস্যকর হয়ে দাঁড়াবে। আমলাতন্ত্রের সাধনার একটি হচ্ছে গাম্ভীর্য বজায় রাখা এবং হাস্যকরতায় পরিণত না হওয়া। হাসলে কেউ মানবে না, অন্তঃসারশূন্যতা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে পড়বে; কিন্তু আমি আরো একটি বিপদের কথা ভেবেছিলাম। সেটি ঐ কাব্যযশো প্রার্থীকে নিয়েই। ‘রামের সুমতি’র রামের মতো তিনি যদি বলে বসতেন, ‘সরকার কোথায় থাকে? আমি তার সঙ্গে দেখা করব।’ তারপর কোনো নিষেধ না মেনে যদি পাশের কামরার এক ধাপ উঁচু আমলাটিকে ধরে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আপনি কি সরকার?’ তিনি সরকার নন শুনে কবি যদি লাফিয়ে উঠে যেতেন দোতলায়, পিওন-চাপরাশি না মেনে; উত্তেজিতভাবে বলতেন, ‘আপনি কি সরকার? আমার কবিতা আপনার অপছন্দ?’ কী জবাব পেতেন তা জানি। শুনতেন, সরকার দোতলাতেও থাকে না। থাকে কোথায়? রাওয়ালপিন্ডিতে? ধরা যাক ক্ষিপ্ত কবি হাজির হলেন পিন্ডিতে গিয়ে। খুঁজলেন সরকারকে, এ অফিস ও অফিস করলেন; কিন্তু সন্ধান পেলেন কি সেই সরকারের, যে তার কবিতাটিকে নাকচ করে দিয়েছে, বলে দিয়েছে ওটি ছাপা যাবে না ঢাকার একটি বাংলা মাসিকে? আমরা জানি তিনি পেতেন না। হতে পারে তিনি স্বয়ং আইয়ুব খানের সঙ্গেই দেখা করতেন। আইয়ুব খান কি স্বীকার করতেন যে তিনি সরকার? পাকিস্তানি সামরিক আমলাতন্ত্রের ঐ মুখপাত্রটি যদি বলতেন, ‘হে কবি, তোমাকে আমেরিকা যেতে হবে সরকারের সন্ধানে। কেননা আমরা আসলে তারই হুকুমে চলি’; তাহলে?
এমনটা ঘটতে পারত, যদি ঘটত। কবির কপাল ভালো তিনি অতটা ক্ষিপ্ত হননি, হলে বুঝতেন আমলাতন্ত্র হচ্ছে ঈশ্বরের মতো, যিনি সর্বত্র আছেন, অথচ কোথাও নেই, তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না; কিন্তু বোঝা যায় তিনি আছেন, পুরোহিতেরা সর্বক্ষণ স্মরণ করিয়ে দেন। আমলারা সাকার; কিন্তু আমলাতন্ত্র নিরাকার। আরো প্রশ্ন ছিল বইকি। প্রশ্ন ছিল, ঐ মিথ্যা কথাটা সম্পাদক সাহেব কেন বললেন? জবাব সোজা, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে। আমলাতন্ত্রের নৈর্ব্যক্তিকতা কেবল যে একটা আদর্শ তা নয়, আত্মরক্ষার একটি উপায়ও বটে। সরকার পছন্দ করছেন না বলে আপনি যদি পাঁচটা ধারা ও সাতটা উপধারা দেখিয়ে দেন তাহলে কার সাধ্য উচ্চবাচ্য করে? যত বড় জোঁক হোক ঐ নুনে কাবু, সঙ্গে সঙ্গে। সরকার কী চায় বা না চায় তা কি আমলারা জানেন না? জানেন কি তবে পথের লোকে? আমলাতন্ত্র একটি রহস্যলোক, সেই লোকে সরকার আছে, যে সরকার অদৃশ্য, গোপন দলিলের মতোই এবং অসংখ্য গোপন দলিলে আচ্ছাদিত। তার রহস্যময় অভিপ্রায় আমলাতন্ত্রই বোঝে এবং ব্যাখ্যা করে। ব্যক্তি তার সামনে অত্যন্ত অসহায়।
আরেকটি প্রশ্ন ছিল আমার। সেটি ঐ সম্পাদকের নিজের সম্পর্কে; কিন্তু ছিলেন সৃজনশীল, নিজে লিখতেন এবং অন্যকে উত্সাহিত করতেন লিখতে। ঐ যে তার দ্বৈত ভূমিকা, একদিকে সৃজনশীল ব্যক্তি, অন্যদিকে আমলা, এই গমনাগমনে যদি তিনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, যদি নিজেই অপরিচিত হয়ে দাঁড়ান নিজের কাছে তাহলে? আমলাতন্ত্রের জয় সাক্ষী হয়ে থাকবে সংস্কৃতির পরাজয়ে; ওর লাভে এর ক্ষতি। পুঁজিবাদের সেই আদি প্রতিষ্ঠার যুগে ফ্রান্সিস বেকন তার ‘অব গ্রেট প্লেস’ নামের প্রবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন যে, উঁচু পদ ব্যক্তিকে তার নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে; পদের ক্ষমতা আছে ব্যক্তিকে তার নিজের কাছেই অপরিচিত করে তোলার। অপর থেকে বিচ্ছিন্ন তো হবেই, নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন হবে।
আমলা থাকলেই যে আমলাতন্ত্র থাকবে এমন কোনো কথা নেই, যেমন জনগণ আছে বলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে গণতন্ত্র রয়েছে; কিন্তু সব তুলনার মতো এ তুলনাও অযথার্থ বটে। কেননা আমলাদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে আমলাতন্ত্রমুখী, জনগণের স্বাভাবিক গতি গণতন্ত্রের দিকে নয়। আমলা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি একটি ওপর থেকে নিচে নামা কাঠামোর মধ্যে, নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও নীতির অধীনে নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন। কর্তা নন; কিন্তু কর্তৃত্ব রাখেন। বিশেষজ্ঞ নন, তবে সব বিষয়েই জানেন, অন্তত জানেন বলে বিশ্বাস করেন। আমলাতন্ত্রসম্পর্কে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য লেখক ম্যাক্স ওয়েবার এভাবেই দেখেছেন তাকে। আমলাতন্ত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে, থাকতে পারে ব্যাবসায়িক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও; কিন্তু সরকারি আমলাতন্ত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তার সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িত।
আমলাতন্ত্রের বড় গুণ হলো নিরপেক্ষতা। আরো একটি গুণ রয়ে গেছে প্রচ্ছন্ন, সে হচ্ছে দক্ষতা; আমলাতন্ত্র দক্ষতায় বিশ্বাস করে এবং নিজেকে দক্ষ বলে মনে করে; কিন্তু সেই গুণ আবার দোষ হয়ে দেখা দিতে পারে এবং দেয়ও। যেমন—দক্ষতা। হ্যাঁ, আমলারা দক্ষ হতে চান। দক্ষতার আরাধনা করেন। ঐ পথে উচ্চতর পদলাভ করা যায়, বার্ষিক রিপোর্ট ভালো হয়, ভালো জায়গায় বদলি হওয়া সম্ভব হয়। আমলাদের সম্পর্কে বলা যায় যে, তারা যত বেশি দক্ষ হন, তত বেশি আমলাতন্ত্রী হন, অর্থাত্ একদিকে আত্মসন্তুষ্ট ও অহংকারী হয়ে ওঠেন এবং অন্যদিকে এমন একটি অমানবিক ব্যবস্থাকে পরিপুষ্ট করে তোলেন, যা রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে সমাজ থেকে এবং সমাজে বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলতে থাকে।
আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র, কিন্তু তা বড় রাষ্ট্রের সেবক। রাষ্ট্র যত বৈষম্যমূলক হচ্ছে বুঝতে হবে আমলাতন্ত্র তত দক্ষ হচ্ছে। ঠিক যেমন আমলাতন্ত্র যত দক্ষ হবে দেখা যাবে রাষ্ট্র তত শক্তিশালী হচ্ছে। আমলাতন্ত্রের দক্ষতা তাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করে, বল্গাহীন ক্ষমতা বল্গাহীনরূপে নষ্ট করে—এই নিয়ম যে আমলাদের ক্ষেত্রে সত্য হবে না তা তো হতে পারে না। জনগণকে তাই আমলা ও আমলাতন্ত্র উভয়ের অত্যাচারই সহ্য করতে হয়, উপায়হীনভাবে। খুব সহজভাবেই জিগ্যেস করা তাই সংগত যে, ঐ যে প্রসিদ্ধ ও আরাধিত দক্ষতা এবং অহরহ ব্যস্ততা তা কীসের জন্য? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য? কিন্তু আইন যদি অন্যায় হয় তাহলে?
মার্কস আমলাতন্ত্র সম্পর্কে তত লেখেননি, যত লিখেছেন শ্রেণি-বিভাজন সম্পর্কে; কিন্তু তারও স্পষ্ট ধারণা ছিল যে, আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার যেখানে শেষ মানুষের জীবনের সেখানে শুরু। জীবন বলতে এ ক্ষেত্রে তিনি বুঝেছেন প্রাথমিক জীবনকে, অর্থাত্ উত্পাদন ও ভোগকে। পুঁজিবাদ ও আমলাতন্ত্র উভয়েই বৈষম্য সৃষ্টিতে দক্ষ; কিন্তু পুঁজিবাদ উত্পাদন করে, বিতরণও করে, তার নিজস্ব পদ্ধতিতে, অর্থাত্ বাজারের মধ্য দিয়ে; কিন্তু আমলাতন্ত্র একেবারেই অনুর্বর, উত্পাদনের সঙ্গে সে সম্পর্কহীন, তার কাজ তথাকথিত আইন ও শৃঙ্খলার মধ্যে প্রকৃত উত্পাদককে—অর্থাত্ শ্রমিক শ্রেণিকে আবদ্ধ করে রাখা। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দিলেও দিতে পারে; কিন্তু বিপ্লবের কুত্রাপি নয়। তার কাজ পুঁজির স্বার্থে বিপ্লবকে প্রতিহত করা। জনগণের পক্ষে তাই আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ততটাই ক্ষতিকর, রাষ্ট্রের পক্ষে তা যতটা মঙ্গলজনক। রাষ্ট্র কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্র শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বৃহত্ যন্ত্র।
আমলাতন্ত্র মনে করে যে নিরপেক্ষ। কেবল মনে করে না, নিরপেক্ষতাকে আদর্শায়িতও করে। কোন অর্থে নিরপেক্ষ? নিরক্ষেপ এই অর্থে যে, সে নৈর্ব্যক্তিক, ব্যক্তিগত আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না, তার পছন্দ-অপছন্দ নেই, সে চলে নিয়মমাফিক; কিন্তু আমরা তো জানি যে, ঐ নিয়মগুলো মোটেই মানবিক নয়, নিরপেক্ষ তো নয়ই। আইনকানুন নিয়মনীতি সব কিছুরই উদ্দেশ্য অভিন্ন; যন্ত্র যত ভিন্নই হোক এবং যার হাতেই থাকুক, গান একটাই, সেটি বৈষম্যমূলক (অর্থাত্ পুঁজিবাদী) রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি করা। সে রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখে, শাসিতের স্বার্থের বিপরীতে। ভাবে সেবা করছে; হ্যাঁ, তা করছে বটে; কিন্তু কার? না, জনগণের নয়। সেবা করে শাসকের। জনগণের সেবক (পাবলিক সারভেন্ট) বলে যে দাবি করে সেটা ভান, জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আলখেল্লা, ঐ আলখেল্লা কেবল ধোঁকাই দেয় না, বর্ম হিসেবেও কাজ করে। আপনি তাকে স্পর্শ করতে পারবেন না, কেননা সে ব্যক্তি নয়, সে একটি ব্যবস্থা; আপনি তাকে বিচ্যুত কিংবা পরাভূত করতে পারবেন না, কেননা সে মনে করে সে একটি অত্যন্ত পবিত্র কর্তব্য আদর্শনিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে, যার দরুন ধার্মিকের আত্মসন্তুষ্টি তাকে সর্বদা ঘিরে রাখে। কোন ধার্মিক কবে ভয় করেছে পাপীর ভ্রুকুটিকে?
n লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক
