এই লকডাউন কি যথেষ্ট?

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ২১:৩৮

কোভিডের ভয়ংকর ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট দেশে ঢুকে পড়েছে। প্রতিদিনই  মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যার রেকর্ড ভাঙছে। জুলাইয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে, এমন আশঙ্কা করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সবাই সতর্কতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়লে আমরা হয়তো এ যুদ্ধে হেরে যাব।’ যেকোনো মহামারিতে সতর্কতার বিকল্প নেই। ভাইরাস থেকে রক্ষার একটাই পথ, সতর্কতা।

দেশে কথিত ‘কঠোর’ লকডাউন শেষ হতে চলেছে। কিন্তু ঢিলেঢালা লকডাউনে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাই অনেকেই ভাবছেন, দেশের এখন অন্তত ১৪ দিন কারফিউ দিলে করোনা ভাইরাস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। জনগণের জন্য কষ্টকর লাগাতার লকডাউন না দিয়ে সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ জারি করা যেতে পারে। পার্শ্ববর্তী ভারত ও চীনে এমনটা করে সুফল লাভ করেছে। দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় চিকিত্সাসেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে।

কেউ কেউ তো করোনা ভাইরাস আছে তা মানতেই চায় না। গ্রামে মানুষের মধ্যে এ ধারণা বেশি বিদ্যমান। তাই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন করোনা রোগীর অর্ধেকেরও বেশি গ্রামের। হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগীর অবস্থাই নাজুক। করোনার তীব্রতা অনেক বেশি হলেই হাসপাতালে আসছে এসব রোগীরা। কোনো কোনো জেলায় আক্রান্তের হার ১০০ শতাংশও পাওয়া গেছে, যা রীতিমতো ভয়ংকর! দেশে কোভিড রোগীর চাপ বাড়ায় হাসপাতালগুলোর করোনা ইউনিটে অক্সিজেন ও আইসিইউর জন্য হাহাকার চলছে। করোনা ওয়ার্ডে মারা যাচ্ছে রোগী। রোগীর স্বজনদের আর্তনাদ আর আহাজারি হাসপাতালের পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ কমাতে না পারলে করোনা রোগীদের চিকিত্সা সেবাপরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়বে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। কারণ যে হারে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে সেই হারে কোভিড চিকিত্সাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ অবস্থায়ও মানুষ সচেতন হচ্ছে না। মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। কোভিড শুরুর পর থেকে গত ১৫ মাসে এমনটি দেখা যায়নি। বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন ও ভয়ংকর সময় পার করছে দেশ। লকডাউনের জন্য সরকারকে দুষছেন অনেকেই। কেউ কেউ বলছেন, গরিবের পেটে নাকি লাথি মারা হচ্ছে। লকডাউনে তো সরকারেরই বেশি ক্ষতি। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয় দেশ। সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। তাছাড়া দেশের জনগণের ক্ষতি তো সরকারেরই ক্ষতি। এটা সত্য যে, লকডাউনের ভেতর দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরই কষ্ট বেশি। তাদের খাদ্যসংকটও দূর করা দরকার। মহামারির এই সংকটকালে একজন মানুষও যেন অভুক্ত না থাকে, একজন অসুস্থ মানুষও যেন চিকিত্সা না পেয়ে মারা না যায়।  মানুষ যেন মনুষ্যত্ববোধের কল্যাণধারা থেকে বঞ্চিত না হয় সেটা সরকারকে যেমন ভাবতে হবে, তা দেশের বিত্তবানদেরও ভাবনায় থাকা দরকার। এ দুঃসময় কিন্তু থাকবে না। আঁধার কেটে যাবেই, তখন যেন আমরা উঁচু গলায় বলতে পারি, আমরা মহামারি অতিক্রম করেছি পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধে, চিরায়ত মানবিকতায়, মানবসম্মত মনুষ্যত্ববোধে। যাদের যেমন সামর্থ্য আছে, তারা তেমনভাবে অসহায় মানুষ এবং স্বজনদের পাশে থাকতে হবে।

ভারতের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে বাংলাদেশের পরিস্থিতি। জনগণ যত সমালোচনাই করুক লকডাউনে শিথিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমাদের দেশেই কেবল ঢিলেঢালা লকডাউন পালিত হয়। আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে, খাবারের দোকান বসে। ভারতের কিছু অঞ্চল ছাড়া সারা বিশ্বে এমনটা আর কোথাও নেই। খাবারের হোটেলে ভিড় হচ্ছে বেশি। লকডাউনে খাবারের দোকান থেকে খাবার আনার নিয়ম আছে—তাই এই সুযোগে হোটেলে খাবার আনতে গিয়ে জটলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস বন্ধ রাখা উচিত। অন্তত তা ১৪  দিন। তাতে হয়তো অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে না।

 এই লকডাউনে কিছুটা কাজ হয়েছে; পুরোটা নয়। দেশের মানুষ বড় বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। বাজারে, রাস্তায়, চা-পানের দোকানে আড্ডা জমছে। মিটিং-মিছিলও হচ্ছে কোথাও কোথাও। বিয়েশাদি, এমনকি শুটিংয়ের খবরও ছেপেছে আমাদের পত্রিকাগুলো। কী অদ্ভুত দেশে আমরা বাস করি, লকডাউন কেমন হচ্ছে এটি দেখার জন্য রাস্তায় দলে দলে মানুষ বেরিয়ে আসে। এখনো ভয়ংকর করোনা ভাইরাস বিষয়ে মানুষ যেন হেলাফেলা করে চলছে। পাশের দেশ ভারতের মানুষও হেলাফেলা করে সর্বনাশ করেছে। সেখানে ৪ লাখেরও বেশি লোক করোনায় মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার কঠোর হয়েছে। অসচেতন মানুষকে অর্থদণ্ডসহ গণহারে পিটুনি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। আমাদের দেশেও তা করা উচিত। মনে রাখতে হবে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য কঠোর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। জীবিকার একটা বিষয় আছে, এটা আমরা বুঝি। এটাও সত্য, মানুষের জীবন আগে। জীবন না বাঁচলে জীবিকা দিয়ে কী হবে? সারা দেশকে এর আওতায় আনতে হবে। আগত ঈদকে ঘিরে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের হাতে আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

সতর্কতার অভাবে করোনা ভাইরাসে সারা দেশে মানুষ এমনকি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে অনেক ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। অরক্ষিত অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় হয়তো সামনে সুসংবাদ নেই। এ সময় চিকিত্সকদেরই সবচেয়ে দরকার। চিকিত্সকরা যাতে সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত না হয়ে পড়েন, সে ব্যাপারে সরকার-সংশ্লিষ্টদের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। এ সময় তাদের নিরাপদ রাখা খুব জরুরি। তাই আগে চিকিত্সকদের বাঁচান। চিকিত্সক বেঁচে থাকলে রোগীদের বাঁচানো যাবে। দেশে চিকিত্সকের সংকট রয়েছে। গত দেড় বছরে ইন্টার্নি চিকিত্সকের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মেডিক্যাল কলেজগুলো সচল রাখা দরকার। নিয়ম মেনে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হলে এ ঘাটতি হয়তো হতো না। এ বিষয়টিও সরকারকে ভাবতে হবে। যেভাবেই বলি, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে।

n লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট ও  সমাজ গবেষক