মানসিক বিকাশে সামাজিকীকরণ

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২১, ২১:৩৮

শৈশব মানবজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই সামাজিকীকরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি শিশু পরিবেশ বুঝতে শেখে, ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে, পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিকীকরণে পরিবারের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং পরিবেশে পদচারণা। অথচ বৈশ্বিক মহামারির কবলে পড়ে থমকে গেছে পুরো বিশ্ব। সেই সঙ্গে সামাজিকীকরণের পথগুলোতেও রুদ্ধতার আবাস বইছে। করোনার সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। জীবনপথের প্রথম ধাপে আটকে পড়েছে চার দেওয়ালের মাঝে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেমন যেতে পারছে না, ঠিক তেমনি শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে সাথিদের সঙ্গে খেলার মাঠে ধুলোমাটি আর বল নিতে ছুটতে পারছে না তারা।

অথচ এই শৈশবেই কত কিছুই না করার থাকে শিশুদের। তাদের চঞ্চলতায় মুখরিত হয় জনপদ, হই-হুল্লোড়ে মেতে থাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। আজ সব কেমন যেন শূন্যতায় ভরে উঠেছে! সামাজিকীকরণের বড় মাধ্যম বিদ্যালয় তো শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষাই দেয় না, শেখায় শৃঙ্খলাবোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবপ্রেম। আর সহপাঠীদের মাঝে থেকেই তারা নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখে নেয়, প্রতিভা ও সাংস্কৃতিক গুণাবলির প্রকাশ ঘটে। কত দিন ধরে তারা সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে। শিশুর সামাজিজীকরণে খেলার মাঠ, সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যাবলি, উত্সবসমূহ এখন অনেকটাই গতিহারা। তাই তো তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ পরিবারের সাহচর্য পেলেও অনেকেই অনলাইনে গেম, কার্টুন ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে, যা শিশুর মানসিক বিকাশে বড় প্রতিবন্ধক। করোনায় ‘বাংলাদেশ শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ নিয়ে ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ শিশুর সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট আছে এবং ১১ বছরের নিচে ২৫ শতাংশ শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। বিপদের মুখে আছে ৩২ শতাংশ শিশু। এ ছাড়া ৬৩ শতাংশ শিশু নিজের ঘরে বসেই নেট চালাচ্ছে। তৈরি করছে নিজস্ব জগত্। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রযুক্তির এই তীব্র প্রভাবে, একাকিত্বে বড় হয়ে ওঠা শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়, মানবসেবায় উত্সাহী হয় না এবং তাদের সঠিকভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে না। মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ শিশুর এমন দুরবস্থা কখনোই জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।

শিশুদের এই সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে একমাত্র পারিবারিক সচেতনতাই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, শৈশব শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের সঠিক সময়, আর এতে পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তাই ঘরোয়া পরিবেশে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক বিনোদনের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, শিশুর প্রতি সহনশীল হতে হবে, মনোযোগ দিয়ে তাদের সব কথা শুনতে হবে। কেননা, স্বভাবতই শিশুরা উদ্বেগপূর্ণ ও হতাশাপ্রবণ হয়ে থাকে। তাদের মানসিক অবস্থা খুব দ্রুত বদলায়। এ ছাড়া মতামতকে গুরুত্ব দিলে তারা আত্মবিশ্বাসী হতে শেখে। আর এক ঘণ্টার বেশি সময় প্রযুক্তির জন্য নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ম থেকে আট বছর পর্যন্ত শিশুর মস্তিষ্ক গঠিত হয়। এ সময় ফোনের দিকে বেশি তাকালে চোখ ও মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার গ্লানি সারা জীবন বইতে হয়। আর তাদের সামনেই মোটেও পারিবারিক কলহ সৃষ্টি করা যাবে না। চলমান কোভিড-১৯ নিয়ে ভুল ধারণার অনুপ্রবেশ যেন না ঘটে, সেদিকেও সজাগ হতে হবে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তাই সুন্দর সুন্দর কাজের মাধ্যমে তাদের প্রতিভাকে পরস্ফুিটিত করে তুলতে হবে। যেমন:বাগান করা, ছবি আঁকা, গান ও  আবৃত্তি শেখার মধ্য দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। এতে করে তারাও প্রশান্তি পাবে এবং কিছুটা হলেও সংকটের সময়েও শৈশব হবে স্মৃতিমধুর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।