রবিবার সকালে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচে ঘটে যাওয়া নানা তরতাজা ছবিগুলো আলোচনার টেবিলে সরগরম থাকতেই রবিবার রাতেই ইউরোর ফাইনালের মঞ্চ ঘিরে বসল দর্শক। ভালোভাবে বসেও সারতে পারেনি, অমনি ইতালির জালে ইংল্যান্ডের গোল। মাত্র ১ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে গোল করে এগিয়ে গেল ইংল্যান্ড। প্রথম দ্রুততম গোল ইউরোতে। গোল করলেন লুক শ, ইংলিশদের উল্লাসে কেঁপে উঠল লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। ৬০ হাজার দর্শকের সিকিভাগ ইতালির সমর্থক, গোল হজম করে নীরব-নিথর। ৬৭ মিনিটে গোল শোধ করে (১-১) ইতালিকে খেলায় ফিরিয়ে আনলেন ডিফেন্ডার লিওনার্দো বোনুচ্চি। ৯০ মিনিট শেষ, অতিরিক্তি ৩০ মিনিটও শেষ। টাইব্রেকে গিয়ে ইতালি ৩-২ গোলে ইংল্যান্ডকে হারাল। ইউরোতে ফুটবলের নতুন রূপকথা লিখল ইতালি। ৫৩ বছর পর ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালি।
অথচ ফাইনালের আগে ইতালিকে পাত্তাই দেয়নি ইংল্যান্ড। বারবার স্লোগান দিয়ে আসছিল ইটস কামিং হোম। অর্থাত্, ট্রফি ইংল্যান্ডে আসছে। ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হবে। ফাইনালের পর ইংলিশ সমর্থকদের টিপ্পনি কেটে ইতালিও বলেছিল, ইটস কামিং রোম। ফাইনাল শেষে টিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে লিওনার্দো বোনুচ্চি বলছিলেন, ‘আমাদের আরো বেশি করে পাস্তা খাওয়া দরকার। কারণ তোমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কটাক্ষ করেছিলে।’
উত্সবে ইতালি। সেই ১৯৬৮ সালে ইতালি প্রথমবার ইউরো জিতেছিল। পরবর্তী প্রজন্ম শুধু গল্পই শুনে গেছে। ২০১২ সালে ইউরোর ফাইনালে উঠেও ট্রফি ধরা হয়নি। রবিবার ফাইনালের রাতে সিএনএন দেখিয়েছে, রোম শহরে উত্সবের তাণ্ডব ঘটে গেছে। সব মানুষ রাস্তায়। ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারায় গভীর রাতে রঙে রঙে রোম শহর রঙিন হয়ে উঠেছিল। ওয়েম্বলির মাঠে ইতিহাস হয়ে রইলেন কিয়েসা, লিওনার্দো বোনুচ্চিরা।
ইউরোর কোনো ম্যাচ না হেরে, সাত ম্যাচ খেলে চ্যাম্পিয়ন হলো ইতালি। ১৩ গোল করে ৪ গোল হজম করেছে। টানা ৩৪ ম্যাচ না হারার পেছনের নায়ক কোচ রাবার্তো মানচিনি। ইতালির ফুটবলের গৌরবের কথা বাংলার ফুটবল দর্শকের জানা। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক বাংলাদেশে থাকলেও এখানেও আছে ইতালির ফুটবল সমর্থক। পাওলো রসি, দেল পিয়েরো, পাওলো মালদিনি, রাবার্তো ব্যাজিও, আন্দ্রে পিরলো, টট্টি, জোলা, বুফনদের কথা বাংলাদেশের ফুটবলপ্রিয়দের মুখে শোনা যায়। এই ইতালি ফুটবল মাতিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। অথচ দেশটি ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বেই খেলতে পারেনি।
রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে ব্যর্থ হওয়ার পর রবার্তো মানচিনির হাতে ইতালি জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মানচিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর ৩৪ ম্যাচ খেলে অপরাজিত থাকে। সব মিলিয়ে গোল হজম করেছে ১১টি। ইউরোতেও হারেনি। অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ইতালির এই সাফল্যের পেছনে আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে করোনা। করোনা যখন অনেকের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছিল, খেলা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই করোনার অভিশাপ ইতালির ফুটবলারদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। ২০২০ সালের ইউরো এক বছরের জন্য পিছিয়ে যায়। সেই সুযোগে মানচিনি তার দল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই এক বছরে খেলোয়াড়দের গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন করেন। কীভাবে সাফল্য তুলে আনতে হবে সেই টনিক কাজে লাগালেন।
