‘অনেক লড়াই সংগ্রাম করে আমার জীবনটাকে গড়ে তুলেছিলাম। যা আজ মূল্যহীন। কীভাবে বেঁচে আছি তা লিখে বোঝাতে পারব না। এটাকে ঠিক বেঁচে থাকা বা জীবন বলে না। এ জীবন সত্যিই আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আমি খুব গরিব মানুষ। আমার জীবনটাকে বাঁচান। আমি বাঁচতে চাই।’ কারাগারের কনডেম সেল থেকে বাঁচার জন্য এভাবেই আকুতি জানিয়ে আইনি সহায়তা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন ফাঁসির আসামি স্বপন কুমার। স্ত্রী হত্যা মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মাথায় নিয়ে ১৫ বছর ধরে আছেন কনডেম সেলে। শুধু স্বপনই নয়, এ রকম অনেক অসচ্ছল ও দরিদ্র ফাঁসির আসামির জেল আপিল এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে।
দীর্ঘদিন ধরে কনডেম সেলে পড়ে আছেন, কিন্তু অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগ দিতে না পেরে আপিল শুনানি হচ্ছিল না—বিষয়টি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের দৃষ্টিতে আসে। এরপরই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন।
সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি জেল আপিলের শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আসামিদের এসব আপিল খারিজ করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। খারিজকৃত জেল আপিলগুলোতে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল আদালত। আর মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে চার ফাঁসির আসামিকে। এছাড়া এক জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে ১০ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন—বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এছাড়া আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় আরো ২১টি জেল আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার সারা দেশে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয়। ঐ ঘোষণার পরই প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগে ভার্চুয়ালি বিচার কাজ পরিচালনার কথা বলেন। এছাড়া আপিল বিভাগে শুধু ফাঁসির মামলার আসামিদের জেল আপিলের শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের এ সংক্রান্ত মামলার ফাইল বাসায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা বাসা থেকে জেল আপিল মামলা নিষ্পত্তি করব। অন্য কোনো মামলা নয়। সেইভাবেই আপনারা প্রস্তুতি নেবেন।’
ঐ নির্দেশের পরই গত ৬ জুলাই হতে বাসা থেকে ভার্চুয়ালি বিচারকাজ পরিচালনায় অংশ নেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। জেল আপিল নিষ্পত্তি প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, যেসব জেল আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে সবগুলোই ফাঁসির মামলা। এদের কোনো আইনজীবী নাই। দীর্ঘদিন ধরে কনডেম সেলে আছেন। আইনজীবী না থাকায় তাদের আপিল শুনানির জন্য কেউ মেনশন করেন না। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে শাখায় পড়ে থাকা এসব জেল আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। গত কয়েক দিনে ১০টির মতো জেল আপিলের ওপর শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
স্বপনের পক্ষে বিনা পয়সায় লড়েন খন্দকার মাহবুব, ফাঁসি কমে যাবজ্জীবন
স্ত্রী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল স্বপন কুমার বিশ্বাসের। জেল আপিল শুনানির জন্য কারাগার থেকে অনুরোধ জানিয়ে তিনি চিঠি লিখেছিলেন প্রখ্যাত ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। তিনি চিঠিতে লিখেন, ‘আমি খুব গরিব মানুষ। ১৩ বছর ধরে কারা অন্তরীণ। আমাকে আপনার সন্তান মনে করে আমার জীবনটাকে বাঁচান।’ এই চিঠি পেয়েই খন্দকার মাহবুব আপিল বিভাগে আবেদন করেন স্বপনের পক্ষে মামলা লড়ার। প্রধান বিচারপতি ঐ আবেদন মঞ্জুর করেন। শুনানি করেন এই আইন বিশেষজ্ঞ। শুনানি শেষে গতকাল জেল আপিলের রায়ে স্বপন কুমারকে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়।
