কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির জন্য সরকার আর্থিক সহায়তা দেবে --------------সালমান এফ রহমান

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২১, ২১:২৮

ইত্তেফাক রিপোর্ট

কোনো শিল্প কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ (কমপ্লায়েন্স) না থাকলে ভবিষ্যতে দেশের বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের মতো দেশেই বিশেষ তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠন করে সব কারখানাকে কমপ্লায়েন্স করা হবে। কমপ্লায়েন্স হওয়ার ক্ষেত্রে কারখানাগুলোকে সরকার দীর্ঘ মেয়াদে অর্থায়ন করবে। ঋণের ব্যবস্থা করবে।

গতকাল মঙ্গলবার চামড়াশিল্প নিয়ে এক অনলাইন আলোচনাসভায় এসব কথা বলেন তিনি। রিভাইভিং দ্য লেদার সেক্টর ইন দ্য আফটারম্যাথ অব কোভিড-১৯-বিষয়ক আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ), দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্স অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।

ইআরএফের সভাপতি শারমীন রিনভীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তিনটি পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক ও র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউছুফ। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক ড. মিজানুর রহমান, ডিটিআইইডবি­উটিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম জাহিদ হাসান ও ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জিনাত আরা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, আমাদের দেশের শিল্প কারখানার বড় সমস্যা কমপ্লায়েন্স না হওয়া। তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতাদের চাপে তৈরি পোশাকশিল্প কমপ্লায়েন্স হয়েছে। ব্র্যান্ডগুলোও স্বীকার করছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স। তবে বড় সমস্যা স্থানীয় বাজারের জন্য যারা পণ্য উত্পাদন করেন তাদের। সর্বশেষ সেজান জুস কারখানায় আগুণের ঘটনা তার প্রমাণ। সব আন্তর্জাতিক পত্রিকায় এর শিরোনাম হয়েছে, যা আমাদের জন্য নেতিবাচক।

তিনি বলেন, এখন  প্রশ্ন হলো, স্থানীয় শিল্পকারখানাকে কীভাবে কমপ্লায়েন্স করব। আমি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের মতো কিছু একটা করতে হবে। কমপ্লায়েন্স করার জন্য কারখানাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হবে। সরকার সেক্ষেত্রে কারখানাগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থায়ন করবে। ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, যেসব স্থানীয় শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স থাকবে না তাদের পণ্য বাজারে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রসঙ্গে সালমান এফ রহমান বলেন, ‘আমরা এখনো এটাকে কমপ্লায়েন্স করতে পারিনি। সিইটিপির নকশা যারা করেছিলেন, তারা কাজটি সঠিকভাবে করেননি। আমরা অত্যধিক মাত্রায় বুয়েট-নির্ভর হয়েছি। কিন্তু বুয়েট আমাদের সাংঘাতিকভাবে ভুল পথে হাঁটিয়েছে। বারবার ভুল নকশা করেও তা স্বীকার করেনি। আমাদের ঘুরিয়েছে। তবে যেহেতু একটা অবকাঠামো হয়ে গেছে, তা ভেঙে ফেলা যাবে না। এখন এটাকে সংস্কার করে এগোতে হবে।

গার্মেন্টসের মতোই সব খাতে সুবিধা দেওয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, গার্মেন্টস যে সুবিধা পায়, তা পেলে অন্য খাতও ভালো করবে এটা আমরা সবাই বুঝি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একমত। এটার ওপর আমরা শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজ করছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলব তা নিয়ে যেন কাজ করা হয়।

অনুষ্ঠানে ড. আব্দুর রাজ্জাক তার প্রবন্ধে বলেন, করোনায় এই সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ১০ শতাংশ কমলেও চামড়াজাত পণ্যের বাণিজ্য কমেছে ২২ শতাংশ। অর্থাত্ চামড়াজাত পণ্য খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অন্যদিকে বৈশ্বিকভাবেই ননলেদার পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি কাঁচামালের দামও বাড়ছে। ফলে চামড়াশিল্পের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে চীন থেকে বড় বড় ব্র্যান্ডের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা দারুণ বলে মনে করেন তিনি। এর জন্য ট্যানারি শিল্পনগরীকে উপযুক্তভাবে গড়ে তোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

আবু ইউসুফ বলেন, চামড়াজাত পণ্যের তিনটি আইটেমে (লেদার, লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার) গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য সর্বস্তরে কমপ্লায়েন্স হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। পশু পালন, পশু জবাই, কাঁচা চামড়া প্রস্তুতকরণ ও ট্যানারি কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, এশিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কমপক্ষে ১৫টি ট্যানারি কারখানাকে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়ার ব্যাপার প্রয়াজনীয় কার্যক্রম চলছে।

আরেক প্রবন্ধে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, গত বছর চামড়াজাত পণ্যে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৯ সালের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। তবে বৈশ্বিক বাজারে বিপুল চাহিদা রয়েছে। বিশ্বে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলারের জুতা বিক্রি হয়। এর চাহিদা কমবে না। ব্র্যান্ডগুলো এখনো টেকসই লেদার চায়। তবে লজিস্টিক ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের চামড়াশিল্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘আমাদের অনেক কাঁচামাল থাকার পরও চামড়াশিল্প পিছিয়ে থাকার কারণটা বের করতে হবে।’ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।