এ এক ভিন্ন সময়, ভিন্ন জীবন!

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২১, ২১:৩০

জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে। সর্বার্থেই। প্রায় দেড় বত্সরাধিককাল যাবত্ সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক জীবন যেন থমকাইয়া গিয়াছে। পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সহিত কুশল বিনিময় করিতে পারিতেছেন না, পাইতেছেন না নিকটজনের সান্নিধ্য। বরং এক সদস্যের অসুস্থতার কথা শুনিয়া অন্য সদস্য দেখিতে যাওয়া তো দূরে থাক, ভয়ে আরো গুটাইয়া যাইতেছেন। বন্ধ হইয়া গিয়াছে বন্ধু-স্বজনের সহিত সম্মুখ আড্ডা-আলোচনা। মানুষ অবসাদগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটিয়াছে তাহা নহে, ইহা একটি বৈশ্বিক ফেনোমেনন, বৈশ্বিক বাস্তবতা। দেশে দেশে চলিতেছে লকডাউন। কথাটি শুনিতে যতটা সহজ, বিষয়টি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিলে ইহার গুরুত্ব বুঝা যাইবে; সকল কিছু বন্ধ, রাস্তাঘাট ফাঁকা, মানুষ ঘরবন্দি, সরকারের অফিস-আদালত বন্ধ—ইহা এক কথায় অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা! গোটা পৃথিবী যেন একটি ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে’ প্রবেশ করিয়াছে। 

অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা করিলে তাহা যেন আরো করুণ দৃশ্য আমাদের সম্মুখে চিত্রায়িত করিয়া চলিয়াছে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুসমূহেও অসংখ্য কোম্পানি-ফ্যাক্টরি লে অফ ঘোষণা করিতে বাধ্য হইয়াছে। প্রথম দিকে ভাবা হইয়াছিল—ইহা হয়তো অতি সাময়িক সমস্যা, যাহার ধাক্কা বিশ্ব শিগিগরই কাটাইয়া উঠিতে পারিবে; কিন্তু এই করোনা সংক্রমণে একের পর এক ঢেউ এবং নূতন ভ্যারিয়েন্ট আক্ষরিক অর্থেই এখন বিচলিত করিয়া তুলিয়াছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হইতেছে ব্যাপকভাবে, যাহা পুনরায় গড়িয়া তুলিবার তাগিদ অনুভব করিতেছেন বিশ্বের নেতৃবৃন্দ। কোভিডকে কেন্দ্র করিয়া বেশ কিছু দেশে ইতিমধ্যেই দেখা দিয়াছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। বহু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হইয়া পড়িয়াছে স্থবির। গ্লোবাল ফান্ড ফর চিলড্রেন এক হিসাব কষিয়া দেখাইয়াছে, বিশ্বের ১৯০টি দেশের ১৫০ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যাহত হইয়াছে এবং আড়াই কোটি শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে শিক্ষা হইতে ঝরিয়া পড়িয়াছে। ব্যাহত হইতেছে আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসায়-বাণিজ্যের অনেক পণ্য গোডাউনেই পড়িয়া থাকিতেছে। উল্লেখ্য, বিশ্ব এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করিয়াছে যে, একটি দেশ একা ভালো থাকিবার কোনো সুযোগ নাই। অপরাপর দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য সকল কিছু বন্ধ হইয়া থাকিলে তাহা নিজ অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলিবেই।  

হতাশার আরো বড় একটি দিক হইল, এই রোগের চিকিত্সায় কোনো সুনির্দিষ্ট ঔষধ অথবা পথ্য আবিষ্কৃত হয় নাই এখন অবধি। ভ্যাকসিন প্রদানের কাজ চলিতেছে বটে; কিন্তু তাহাও এখন পর্যন্ত কোনো দেশকেই কোভিড হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত করিতে পারে নাই। বলা হইতেছে, টিকা গ্রহণ করিলে অসুখ হইবে না তাহা নহে, তবে হয়তো মৃত্যু ঠেকানো যাইবে। ইহাও বিশ্ববাসীকে এক দ্বিধার মধ্যে রাখিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, উন্নয়শীল দেশসমূহের সার্বিক অবস্থা করুণতর। সীমিত সম্পদের দেশসমূহে এমনিতেই অসন্তোষের মাত্রা অধিক। অধিকন্তু সমালোচনাও সহ্য করিতে হয় অধিক; কিন্তু এই সকল দেশের অর্থনীতির দিকে তাকাইয়া দেখিতে হইবে। এই প্যান্ডামিক সীমিত সম্পদ, স্বল্প সামর্থ্যের দেশসমূহকে ভঙ্গুর করিয়া তুলিয়াছে। শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা যাইতেছে না। বাংলাদেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। এহেন পরিস্থিতিতে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কীই-বা করিবার আছে। জগতের প্রতিটি বড় ধর্মেই ধৈর্যের পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে। ইসলাম ধর্মের পবিত্র কোরআন শরিফে বলা হইয়াছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সুরা আল ইমরান, পারা-৪)। সুতরাং ইমানের সহিত ধৈর্য ধারণ হইবে আমাদের সবচাইতে বড় কর্তব্য।