করোনা আতঙ্ক তাড়া করছে প্রতিটি মুহূর্ত। প্রতিটি দিন যেন উঠতি বয়সি তরুণ ও যুবকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা-সংকটে দেশ-বিদেশে চলছে কর্মী ছাঁটাই; বাড়ছে বেকারত্ব, ফলে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে সীমিত। জাতিসংঘের এক জরিপে উঠে এসেছে, করোনাকালে বিশ্বের অর্ধেক তরুণ-তরুণী উদ্বেগ ও হতাশায় আক্রান্ত। এমনিতেই দেশে বেকারত্বের হার অনেক; কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে সেই সংকট আরো বেড়েছে। হতাশাগ্রস্ত তরুণরা হচ্ছে বিপথগামী। জড়িয়ে পড়ছে নেশা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে।
আমাদের দেশে অন্তত ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী তরুণ এবং কর্মক্ষম, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছর। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে হিমশিম খেতে হয়। কর্মে সক্ষম নতুন যোগ হওয়াদের মধ্যে অর্ধেক থেকে যায় বেকার। আবার অদক্ষ, অল্প দক্ষদের বড় অংশ কাজ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এমন বাস্তবতায় করোনার হানায় নতুন নিয়োগ বা কাজের জোগান হয়েছে সীমিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে ২০১৫ সালে স্নাতক বেকারের হার ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার বেড়ে ৩৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৪১ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪৩ শতাংশে পৌঁছে। ২০১৯ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ শতাংশে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ আর ২৭ লাখ বেকার। আর সম্ভাবনাময় কিন্তু সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান না এরকম ব্যক্তি (লেবার আন্ডার ইউটিলাইজেশন), যাদের ছদ্ম-বেকার বর্ণনা করা হয়, এরকম মানুষ রয়েছেন প্রায় ৬৬ লাখ। এরা চাহিদা মাফিক কাজ না পেয়ে টিউশনি, রাইড শেয়ারিং, বিক্রয়কর্মী ইত্যাদি খণ্ডকালীন কাজ করেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রতি চার জন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছে (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। বেকারত্বের হারের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয়। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ-তরুণী বাংলাদেশের চাকরির বাজারে যোগদান করে। তাদের বড় একটি সংখ্যা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। আইএলও বলছে, মহামারিতে তারা তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে বেকারত্ব, সেই সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে। এতে চাকরিতে প্রবেশ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। হতাশাগ্রস্ত অনেকে আবার কঠিন জীবন থেকে পরিত্রাণ পেতে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। করোনাকালে গেল এক বছরে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট—এসব আত্মহত্যার মূল কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দশম। তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে।
করোনাকালে তরুণ ও যুবকদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোরও। শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে এই জরিপে দেখা যায় যে শিশুরা এই পরিস্থিতে মানসিক বেদনা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। মহামারির সময়ে শিশু ও তরুণদের জীবনে ছন্দপতনের জন্য সরাসরি তিনটি সমস্যা বেড়ে গেছে। এক. শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, দুই. সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক অবসাদ এবং তিন. পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া। ৯১ শতাংশ শিশু ও তরুণ স্কুল বন্ধের কারণে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ অনুভব করছে।
আমরা জীবনে কখনো কখনো দুঃশ্চিন্তা, হতাশা, বিষণ্নতা ও একাকীত্ব অনুভব করি। মাঝেমধ্যে এই অনুভূতিগুলো এতটাই অসহনীয় হয়ে পড়ে যে, তা নিজের পক্ষে সামলানো সম্ভব হয় না। তখন আমরা মনে করি, এই সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই এবং এটি আমাকে সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে। ফলে, আমরা বিভিন্ন রকম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি এবং কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথও বেছে নেয়। করোনাকালীন এমন সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা কিংবা তরুণ ও যুবকদের মানসিক এ ধরনের অবসাদ দূর করতে দরকার সঠিক কাউন্সিলিং। তার জন্য পরিবারের মানসিক সহযোগিতার পাশাপাশি একজন পেশাগত কাউন্সিলরের সহযোগিতা নেওয়া দরকার। পেশাগত কাউন্সিলর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগত থেরাপি প্রদানের মাধ্যমে ব্যক্তির আত্ম-উন্নয়ন ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে থাকেন। ফলে সমস্যা ও মানসিক অবসাদ কাটিয়ে ঐ ব্যক্তি নিজেই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। মনে রাখতে হবে, জীবন তো একটাই। বেঁচে থাকার মধ্যেই তাই জীবনের সার্থকতা এবং জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার মধ্যেই আছে জীবনের সুবাসিত রূপ। আত্মহনন যে কোনো সমাধান নয়—তরুণ হূদয়ে সে বোধ সৃষ্টি করার জন্য পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। তাহলেই আত্মহনন বা আত্মঘাতী হওয়ার পথ বেছে নিতে কেউ উত্সাহিত হবেন না।
n লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট
