চট্টগ্রামে নতুন ধরনের মাদক ক্রিস্টাল মেথে আসক্তি বাড়ছে যুবসমাজের। ‘আইস’ নামে পরিচিত এই মাদকের কার্যকারিতা ইয়াবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। দামও বেশ চড়া। প্রতি কেজি বিক্রি হয় কোটি টাকায়। তবে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের নেশাগ্রস্ত সন্তানরা দামের পরোয়া করে না। তা ছাড়া, ইয়াবার তুলনায় আইস সেবন করা সহজ। ইয়াবা সেবন করতে কিছুটা প্রস্তুতির দরকার পড়লেও কম সময়ে প্রস্তুতিতে পাইপের সাহায্যে আইস সেবন করা যায়। এ কারণে যারা আগে ইয়াবা সেবন করত মূলত তারাই এখন ঝুঁকে পড়েছে আইসের দিকে।
চিকিত্সকদের মতে, আইসে স্বল্প সময়ের মধ্যে নেশা হলেও এর অনেক ক্ষতিকারক দিক রয়েছে। মেথামফিটামিন উপাদানযুক্ত দানাদার মাদক আইস সেবনে অনিদ্রা ও অতি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর ফলে স্মৃতিভ্রম, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হূদরোগ, কিডনি, লিভারের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। এছাড়া দাঁত ক্ষয়, অতিরিক্ত ঘাম, চুলকানি, রাগ ও আত্মহত্যার মতো ভয়ানক প্রবণতা তৈরি হয়। ভয়াবহ ক্ষতির কথা জেনেই ছাত্র ও যুবসমাজ এই মাদকের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল ইত্তেফাককে বলেন, উন্নত পদ্ধতিতে প্রসেস করা হয় বলে আইস অতি উচ্চ ক্ষমতার একটি মাদক। এর ‘হাইপার একটিভ ইফেক্ট’ (কার্যকারিতা) অনেকটা কোকেনের মতো। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে দেয়। তাই ইয়াবা সেবনকারীদের পরবর্তী পছন্দের তালিকায় ঢুকে পড়েছে আইস।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, বাংলাদেশে আইসের ব্যবহার শুরু হয় ২০১০ সালের দিকে। চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে আইসের ব্যবহার হলেও কেনাবেচার কাজ অতি সঙ্গোপনে হওয়ার কারণে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগোচরে রয়ে যায়। আইস দেখতে অনেকটা মিছরির মতো। তাই এটি প্রকাশ্যে বহন করলেও কেউ সহজে সন্দেহ করে না। চট্টগ্রামে এবছর আইসের দুটি চালান র্যাবের হাতে ধরা পড়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর খুলশী এলাকা থেকে ১৪০ গ্রাম আইসসহ দুজনকে আটকের পর গত সোমবার কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা নতুন ফিসারিঘাট থেকে ৯৭৫ গ্রাম আইসসহ তিন জনকে আটক করে র্যাব। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে আইস কেনাবেচা হয়েছে তা র্যাবের কাছে আটক ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিতেই উঠে এসেছে। র্যাব জানায়, নানা পেশার মানুষ আইস পাচারে জড়িত। মূল পেশার আড়ালে তারা আইস পাচার করছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কাজী আমিনুর রশিদ একসময় ব্যাংকে চাকরি করত। দুই বছর আগে সে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে আবাসন ব্যবসা শুরু করে। তবে এসবের পাশাপাশি সে একজন মাদক ব্যবসায়ী। এছাড়া আটক শহিদুল ইসলাম টিপু মোটর মেকানিক এবং মো. সাইমন তারেক ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, কয়েকটি দেশ ঘুরে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আইস। এই রুটে অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লাওস, চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। মাদক ব্যবসায়ীরা টেকনাফ সীমান্ত থেকে আইস সংগ্রহ করে সড়ক বা নৌপথে ঢাকাসহ সারা দেশে পাচার করে। ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে চট্টগ্রামকে ব্যবহার করা হয়। তবে নতুন মাদক হওয়ায় আইস পাচারকারী সিন্ডিকেটের নেপথ্য শক্তিকে এখনো শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাব-৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল বলেন, চট্টগ্রামে আইসের যেসব চালান ধরা পড়েছে সেগুলো এসেছে মিয়ানমার থেকে। তবে এটি ল্যাবরেটরিতেও তৈরি করা সম্ভব। আইসের চালান ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়েও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
