অবাক পৃথিবী দ্য গ্রেট ব্লু হোল

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২১, ২০:৫৯

 

কমিপউটারের স্ক্রিনে কিংবা ক্যালেন্ডারের পাতায় আমরা অনেকেই সমুদ্রের মাঝে দারুণ সৌন্দর্যমন্ডিত বিশাল এক গর্তের দৃশ্য দেখেছি। অপরূপ এই দৃশ্যটি দেখতে অনেকটা কৃত্রিম গ্রাফিক্সের কাজ মনে হলেও সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীতে জায়গাটির অবস্থান রয়েছে। সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত বিশালাকার নীল রঙের এই জায়গাটিকে বলা হয় দ্য গ্রেট ব্লু হোল। ব্লু হোল নামটি শুনে অনেকে ব্লাক হোলের সঙ্গে এর সাদৃশ্য খুঁজতে পারেন। আদতে মহাকাশের মহাবিস্ময়কর ব্লাক হোলের সঙ্গে ব্লু হোলের কোন সমপর্ক নেই। দ্য গ্রেট ব্লু হোল মধ্য আমেরিকার দেশ বেলিজ এর সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত একটি বৃহত্ সমুদ্রগর্ভস্থ গর্ত। এটি মূলত একটি বিশাল কেভ নেটওয়ার্কের প্রবেশদ্বার। দ্য গ্রেট ব্লু হোল বেলিজ সিটি থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে উপকূলবর্তী প্রবাল প্রাচীরের কেন্দ্রে অবস্থিত যেটি বেরিয়ার রিফ রিজার্ভ নামে পরিচিত । বেলিজের সাতটি বিখ্যাত প্রবাল প্রাচীরের মধ্যে লাইটহাউজ প্রাচীরটির কেন্দ্রেই দৈত্যাকার এই সামুদ্রিক গর্তের অবস্থান। ব্লু হোলের আকৃতি বৃত্তাকার, ব্যাসার্ধ ৩০০ মিটার (৯৮৪ ফুট) এবং গভীরতা ১২৪ মিটার (৪০৭ ফুট)। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির ১২৫ মিটার গভীরে ৩১০ মিটার চওড়া এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এলাকাটি বিশ্বের জনপ্রিয় স্কুবা ডাইভিং ডেস্টিনেশন। স্কুবা ডাইভাররা গত কয়েক যুগ ধরে এর উপরস্তরের পানিতে অনেক সাঁতার কেটেছেন। কিন্তু এই দৈত্যাকার গর্তের গভীরে অন্ধকারাচ্ছন্ন জগতে খুব কম ডুবুরিই পৌঁছাতে সাহস করেছেন।   

ধারনা করা হয় প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে যখন শেষবার বরফযুগ চলছে তখন পৃথিবীর সব পানি জমে জমে জড়ো হয়েছিল মেরু অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠও তাই তখন ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে অনেক নিচুতে। সেই সময় বেলিজের সমুদ্রপৃষ্ঠ ছিল এখনকার চাইতেও আরো ১৫০ মিটার নিচুতে। তখন ক্যালসিয়াম কার্বনেট জাতীয় পদার্থ জমে তৈরি হয় পাথর, আর সেই পাথর দিয়ে সৃষ্টি হয় ব্লু হোল কেভের বিশাল কাঠামো। কিন্তু বরফ যখন আবার গলতে শুরু করে, সাগরের পানির উচ্চতাও বাড়তে শুরু করে এবং পানির নিচে ডুবে যায় সেই বিশাল কাঠামো। ধারণা করা হয় আজ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার বছর আগে পুরো কেভ নেটওয়ার্কই পানির নিচে পুরোপুরি ডুবে যায়। ঠিক তখনই কয়েক জায়গার পাথর ভেঙে সৃষ্টি হয় ব্লু হোলগুলোর সমন্বয়ে বৃহদাকার কেভ নেটওয়ার্ক।

ব্লু হোলের ভেতর রয়েছে সমপূর্ণ আলাদা একটি জগত। সামুদ্রিক প্রবাল এবং জলজ উদ্ভিদ দ্বারা সন্নিবেশিত এই স্থানটির জীববৈচিত্র্য জগদ্বিখ্যাত।  নানা বিরল প্রজাতির প্রচুর প্রাণী রয়েছে যা শুধু এই স্থানের অতল গভীরেই দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে অ্যাকুয়াটিক সাবমেরিন কোমপানির দুই জন ক্রু ব্লু হোল গর্তটির একটি থ্রিডি ম্যাপ তৈরি করার উদ্দেশ্যে সিঙ্কহোলের গভীরে নামার সাহস করেন। নামার পথে তারা কিছুবিষয় লক্ষ করেন, তাদের চোখে পড়ে কচ্ছপ, দৈত্যাকার কোরাল এবং রিফ শার্ক।  কিন্ত ৯০ মিটার গভীরে নামতেই তাদের জীবনের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। কারণ সেখানে রয়েছে প্রানঘাতী হাইড্রোজেন সালফাইডের পুরু আস্তরণ, গর্তটির পুরো তলানি জুড়ে যা ভাসমান চাদরের মতো ছড়িয়ে আছে।   সেখানে কোন অক্সিজেন নেই বলে কোন প্রাণের অস্তিত্বও নেই। কোন প্রাণী যদি ভুলক্রমে এখানে এসেও পড়ে তবে তার মৃত্যু অবধারিত। এই জায়গায় অসংখ্য প্রানীর কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেন তারা।

গবেষক এবং বিজ্ঞানীদের মতে, দ্য গ্রেট ব্লু হোল পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। ২০১২ সালে ডিসকভারি চ্যানেল এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে অভূতপূর্ব জায়গার তালিকায় প্রথম স্থানে রাখে। ইউনেস্কো দ্য গ্রেট ব্লু হোলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদায় ভূষিত করেছে।

এইচ এম নাজমুল আলম