নিজের ভালো কি সকল পাগল বোঝে?

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২১, ২১:৩২

অত্যন্ত হাইভোল্টেজ ইউরো কাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডে গত রবিবার রাত্রে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়া যায়। পেনাল্টি শুট-আউটে ইতালির নিকট ইংল্যান্ড ৩-২ গোলে পরাজিত হয়, আর যেই তিনটি গোল ইংল্যান্ড মিস করে, সেই তিনটিই শুট করিয়াছেন ইংল্যান্ডের তিন জন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়। পেনাল্টি শুট-আউট বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রা হরহামেশাই মিস করেন। নব্বইয়ের বিশ্বকাপে দারুণ ফর্মে থাকা সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ম্যারাডোনাও পেনাল্টি মিস করিয়াছিলেন। তাহা ছাড়া কেহই চাহে না পেনাল্টি শুট-আউট মিস করিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ইংল্যান্ড তিনটি পেনাল্টি মিস করে, আর তিনটি শুটই  করিয়াছেন তিন জন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়। এমনিতেই ইংল্যান্ড খেলার শুরুতে গোল করিয়া আগাইয়া গিয়া জয়ের আনন্দে ভিসুভিয়াসের মতো টগবগ করিতেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নাই, আর তাহার জন্য সকল রাগ-জিঘাংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা বিস্ফোরিত হয় ঐ তিন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের উপর। ইউরোর আগে ঘটা করিয়া বর্ণবিদ্বেষ দূর করিবার জন্য হাঁটু মুড়িয়া বেশ কয়েকটা ম্যাচে শপথ লইয়াছিলেন গ্যারেথ সাউথগেটের দল। বিভিন্ন বর্ণের, সম্প্রদায়ের ইংল্যান্ড দলের এই দৃষ্টান্ত ফুটবল-বিশ্বে প্রশংসাও কুড়াইয়াছিল। অতঃপর পেনাল্টি শুট-আউট মিসের পরই বাহির হইয়া পড়িল শ্বেতাঙ্গদের চেনা রোগ! বর্ণবিদ্বেষ! যদিও ইংরেজ কোচ কৃষ্ণাঙ্গের পক্ষ লইয়া বলিয়াছেন, আমরা একসঙ্গেই জয় ও পরাজয় বরণ করিয়া থাকি।

তাহা তো বটেই। কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়রা চাহিলেই তো শুট-আউট করিবার দায়িত্ব পাইতেন না। ১১ জন খেলোয়াড় ও বদলি খেলোয়াড় মিলাইয়া কমপক্ষে ১৪ জন হইতে মাত্র পাঁচ জন পেনাল্টি শুট আউটের দায়িত্ব পান। যাহারা সবচাইতে যোগ্য, তাহাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অধিনায়ক-কোচসহ পুরো টিম ম্যানেজমেন্ট। সুতরাং ঐ কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের যে কোনো দোষ নাই, তাহা স্বাভাবিক বোধবুদ্ধিসম্পন্ন যে কেহ অনুধাবন করিতে পারিবেন। কিন্তু তাহার পরও কেন ইংরেজ সমর্থকরা ফুঁসিয়া উঠিলেন? তাহা হইল শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ। বিশ্বের সকল মানুষ সমান—ইহা তাহাদের মুখের কথা, মনের কথা নহে। এই যে কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের দেশে বসবাস করিতেছে, এই কৃষ্ণাঙ্গদের পূর্বপুরুষরা ক্রীতদাস হিসাবে আসিয়াছিল। কলুর বলদের মতো তাহাদের নির্মমভাবে উদয়াস্ত খাটানো হইত। হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখিত বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘আংকল টমস্ কেবিন’-এ আমরা ইহার সামান্য পরিচয় পাইয়াছি। আজও ‘আই কান্ট ব্রিথ’ আমাদের শুনিতে হয়। ২০১৫ সালে প্যারিসে ব্রিটিশ ক্লাব চেলসি এবং ফরাসি ক্লাব সেন্ট জার্মেইনের মধ্যকার চ্যাম্পিয়নস লিগের একটি ম্যাচের আগে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে ট্রেন হইতে একদল শ্বেতাঙ্গ ধাক্কা দিয়া নামাইয়া দেয়। তাহার পর তাহারা স্লোগান দিতে থাকে—‘আমরা বর্ণবাদী। আমরা বর্ণবাদী। আমরা এটাই পছন্দ করি।’

আমরা যাহাদের নিকট হইতে মানবতার পাঠ গ্রহণ করি, হঠাত্ কোনো ঘটনায় তাহাদের ভিতরকার কুিসত বর্ণবাদী রূপ বাহির হইয়াই যায়। তাহারা ধনাঢ্য প্রথম বিশ্ব, আর আমরা গরিব তৃতীয় বিশ্ব। তাহারা ভদ্র ভাষায় আমাদের ডাকে উন্নয়নশীল বলিয়া। বিশ্বের মোট সম্পদের সিংহভাগ তাহাদের দখলে। ভূরাজনীতি, বিশ্ব-অর্থনীতিও তাহারাই নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে, কীসের বলে তাহারা বলীয়ান। উন্নয়নশীল দেশ হইতেই কাঁচামাল লইয়া, সস্তা শ্রম লইয়া তাহারা নিজেদের সমৃদ্ধ করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছে। গড়িয়া তুলিয়াছে নিজেদের সংগঠন। আর উন্নয়নশীল গরিব দেশগুলি ব্যবহূত হইতেছে তাহাদের ক্রীড়নক হিসাবে। অথচ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি যদি নিজেদের মধ্যে শক্ত জোট গড়িয়া তুলিতে পারিত, নিজেদের সম্পদের সদ্ব্যবহার নিজেরাই করিতে পারিত তাহা হইলে প্রথম বিশ্ব কখনোই তৃতীয় বিশ্ব লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে পারিত না। জোট গঠনের চেষ্টা যে কখনো হয় নাই, তাহা নহে। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলি নিজেদের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ করিয়া বৃহত্তর ঐক্য হইতে দূরে থাকে। আর প্রথম বিশ্ব ইহাই চাহে। অন্যের বিভক্তিতেই তাহাদের সমৃদ্ধি। অথচ তৃতীয় বিশ্ব নিজেদের সম্পদের সদ্ব্যবহার করিতে পারিলে প্রথম বিশ্বই তাহাদের নিকট ছুটিয়া আসিত। নিজের ভালো নাকি পাগলও বোঝে। উন্নয়নশীল বিশ্ব কেন বোঝে না?