হাইতির প্রেসিডেন্ট হত্যা ও দেশটির ভবিষ্যত্

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:০২

গত ৭ জুলাই গভীর রাতে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের নিজ বাসভবনে ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইজিকে ‘আততায়ীরা’ গুলি করিয়া হত্যা করে। গুলিতে ফার্স্ট লেডি গুরুতর আহত হন। এই আধুনিক যুগে একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে  নৃশংসভাবে হত্যা করা হইয়াছে, অথচ ইহা এখনো অনেকটাই রহস্যাবৃত। জানা যায়, আততায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এজেন্টের ছদ্মবেশে প্রবেশ করিয়াছিল প্রেসিডেন্টের বাসভবনে। তাহার হত্যার যে বর্ণনা দিয়াছেন ফার্স্ট লেডি তাহা লোমহর্ষক। তিনি বলিয়াছেন, ‘চোখের পলকে ঘাতকেরা আমার ঘরে ঢুকিয়া পড়ে। ইহার পর বুলেট দিয়া তাহারা আমার স্বামীর বুক ঝাঁঝরা করিয়া ফেলে। তাহাকে একটি কথা বলিবারও সুযোগ দেওয়া হয় নাই।’ এই বর্বরোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।

ফার্স্ট লেডি মার্টিন মোইজির মতে, তাহার এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বিরোধী দলই দায়ী। সড়ক-যোগাযোগ, পানি ও বিদ্যুত্ নিয়া স্বার্থের কারণে ঘাতকদের পাঠাইয়া তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে। উত্তর আমেরিকার একটি দরিদ্রতম দেশ হাইতি। ৫৩ বত্সর বয়সি জোভেনেল মোইজি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইতির প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। তাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়াছিল। দেশটিতে সহিংস সরকারবিরোধী বিক্ষোভও হইয়াছিল। ধারণা করা হইতেছে, কলম্বিয়ার ভাড়াটে ও সশস্ত্র প্রাইভেট গ্রুপের সহায়তায় একটি কমান্ডো গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ড ঘটাইয়াছে। ২৮ সদস্যের এই কমান্ডো দলে ছিল ২৬ জন কলম্বিয়ান ও দুই জন হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। মোইজির সমর্থকদের অভিযোগ, হাইতির পুলিশ ও বিরোধী রাজনীতিকরা ‘নোংরা বুর্জোয়াদের’ সঙ্গে মিলিয়া মোইজিকে রাজনীতির ‘বলি’ বানাইয়াছে। তাহার হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল হাইতিতে যান। আমরা জানি, হাইতি স্বৈরশাসন, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অর্থনৈতিক শোষণের লীলাভূমি। বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পাইয়াছে দেশটি। সেইখানে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নিয়াও বিতর্ক ছিল। ২০১৫ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট মিশেল মার্তেলি পরবর্তী নির্বাচনে জোভেনাল মোইজকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করেন। সেই বত্সর তিনি ৩২.৮ শতাংশ ভোট পান। তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে হাজার হাজার মানুষ সহিংস বিক্ষোভে রাস্তায় নামেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৬ সালের জুন মাসে নির্বাচন বাতিল করা হয়। বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হন জোসেলারমে প্রিভেট। ২০ নভেম্বর নতুন নির্বাচনে মোইজি ৫৫.৬৭ শতাংশ ভোট পাইয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, ২০১৫ সালের অমীমাংসিত নির্বাচনের তারিখ হইতে তাহার পাঁচ বত্সর মেয়াদ ধরিতে হইবে, যাহা শেষ হইয়া গিয়াছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তবে ২০১৭ সালে শপথ নেওয়ায় এবং শপথ গ্রহণের তারিখ হইতে হিসাব করিলে তাহার মেয়াদ শেষ হইবার কথা ২০২২ সালে।

হাইতির শীর্ষস্থানীয় দাতাদেশ যুক্তরাষ্ট্র। বিরোধী দলের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় মোইজি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরো বেশিদিন টিকিয়া থাকিতে চাহিয়াছিলেন। এই জন্য গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করা হইয়াছিল। হাইতি প্রায় দুই শতাব্দী ধরিয়া স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরিয়া ফরাসি শাসনাধীন ছিল। ক্রীতদাস উপনিবেশে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে তাহারা বিদ্রোহী হইয়া উঠেন এবং দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেন। ১৯১৫ সাল হইতে দেশটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিদ্যমান। উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশটি এখন কে নেতৃত্ব দিবেন? বর্তমানের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্লদ জোসেফের মেয়াদ ১২ জুলাই শেষ হইবার কথা ছিল। তিনি সরিয়া গেলে নূতন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল নিউরোসার্জন এরিয়েল হেনরির। অবশ্য জাতিসংঘ ঘোষণা করিয়াছে, ক্লদ জোসেফই বৈধ নেতা। কিন্তু বিরোধীরা তাহা মানিতে নারাজ। অতএব, বহুকাল ধরিয়া রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হাইতির ভবিষ্যত্ এখন কোন দিকে তাহা এখনো নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না।