অফিস থেকে একটু আগে আগেই বের হয়ে পড়েছে জাহেদ। বাসে এখনো ভীড় হয়নি, যদিও তার বাসায় ফেরার তাড়া নেই। তাই ধীরু পায়ে হেঁটে সংসদভবনের সামনে গাছের ছায়ায় একটু বসে। দশটাকার বাদাম কিনে খুটে খেতে খেতে নিজের কথাগুলো মনে উঁকি দেয়।
একটা বিস্কুট কোম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করে জাহেদ। কাজটাই পথে পথে ঘোরা। একেক এলাকা একেকদিন নির্ধারিত থাকে, সেখানকার চায়ের টং থেকে সুপারশপে বিস্কুটের চাহিদা টুকে নেওয়া, সাপ্লাই দেওয়া, ক্লায়েন্ট মোটিভেশানও করতে হয়। কাজটা সহজ নয়। দুদিন অফিসে বসে, বাকি চারদিন বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়।
জাহেদের মাথায় একটা চিন্তা, বোনের বিয়ের জন্য কিছু টাকা প্রয়োজন। আব্বা কিছুটা দেবেন, বাকিটা জাহেদকে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অজুহাত চলে না, জাহেদ বড় ছেলে, চাকরি যা হোক একটা করছে, জাকির তো এখনো ছাত্র, ও তো আর দিতে পারবে না। পাত্রের পরিবারও ভালো, হাত ছাড়া করাটা বোকামি। কোনো চাহিদা না থাকলেও মেয়েকে একটু সাজিয়ে দেওয়া বাঙালি পরিবারের রীতি। পাত্রের জন্যও তো কেনাকাটা আছে। সবই জাহেদ বোঝে, কিন্তু টাকাটা কোথা থেকে জোগাড় হবে, সেটা বুঝতে পারছে না। অফিসে দু তিনজনকে বলেছে, ধার হিসেবে নেওয়ার কথা। মাসের বেতন থেকে শোধ করবে।
জাহেদের বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করে না। বাসায় ফিরলে আম্মা হয়তো কোনো প্রয়োজনের কথা বলবেন, হয়তো বাজার করতে হবে, অথবা আটা শেষ বা ডিম আনতে হবে। আব্বাও ঘুরিয়ে পেচিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, টাকার ব্যবস্থা হলো কিনা।
অবশ্য না ফিরেও উপায় নেই, বন্ধুদের আড্ডায় বসতে যে চা সিগারেটের খরচটা লাগে, সেটা খরচ করা তার জন্য বিলাসিতা। যে বেতন পায়, হাজার পাঁচেক পকেটে রেখে বাকিটা সংসারে দিয়ে দিতে হয়।
না, সংসার বলতে বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি এখনো। মা,বাবা, ছোটভাই, আর ছোট বোন। সবাইকে নিয়ে রায়েরবাজারের দিকে ছোট একটা বাসা তাদের। নিজেদের বাসা নয়, ভাড়া বাসা। আব্বা একটা ছোটখাটো চাকরি করতেন, রিটায়ার করেছেন বছর চারেক। আব্বার পেনশনের টাকা আর জাহেদের বেতন, এই মিলে সংসার চলে। আব্বার চাকরি যতদিন ছিল, ততদিন খুব একটা ভাবতে হয়নি। টিউশনির টাকা দিয়ে জাহেদ নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে নিয়েছে। ছোটভাইটাও এখন তাই করে, অনার্স পড়ার খরচ নিজে চালিয়ে নেয়? বোনটা কলেজে উঠেছে সবে। আব্বা চাইছেন ওর বিয়েটা দিয়ে দিতে। তিনি তাহলে নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারবেন। গত সপ্তাহে এক পাত্রপক্ষ এসে দেখে গেল, ছেলেটা একটা ব্যাংকের ক্যাশে চাকরি পেয়েছে, নতুন চাকরি। তার পরিবার থেকে তাই বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছে, ছেলের পোস্টিং যেখানে হবে, বউ নিয়ে যাবে সেখানে। নয়তো থাকা খাওয়ার অসুবিধা হয়।
পরিবারের চিন্তা ঠিক আছে। জাহেদের নিজেরও মনে হয়, এখন বিয়েটা করলে ভালো হতো, দিন শেষে ঘরে ফেরার টান থাকত। সব কিছু এখন মা দেখে রাখতে পারেন না। তাছাড়া দিনশেষে নিজের একটা মানুষ লাগে, যার সাথে দুটো সুখদুঃখের গল্প করা যাবে। রাতে ফিরতে দেরী হলেও যে ভাত নিয়ে অপেক্ষা করবে, টেবিলে ঢাকা দিয়ে ঘুমুবে না। অথবা ক্লান্ত হয়ে যখন বাসায় ফিরবে এক গ্লাস শরবত করে দিবে ভীষণ যত্নে। জাহেদ ভাবে, তার একটা ছোট্ট সংসার হলে বিষয়টা মন্দ হতো না। কিন্তু সেটা আরো দুই তিন বছরের আগে ভাবা সম্ভব নয়।এসব এখন ভাবাই বিলাসিতা। সব সময়ই বিলাসিতা ছিল, শেষ বর্ষে পড়ার সময় যখন রুমানার বিয়ে হয়ে গেল, তখনো, সহপাঠীকে বিয়ে করতে চাওয়া বিলাসিতা ছিল। রুমানাও চাইলো না অপেক্ষা করতে, অবশ্য ভালোই হয়েছে, অপেক্ষা করলে জাহেদ এখনো বিয়ে করতে পারত না। রুমানা ভালো আছে? স্বামী সংসার নিয়ে ফেসবুকের হাসিখুশি ছবিগুলো অন্তত সেটাই প্রমাণ করে। এর চাইতে বেশি জাহেদের আর জানার দরকার হয় না।
মাস্টার্স শেষ করার পরপরেই আব্বা রিটায়ার করলেন, জাহেদ তখন সরকারি বা বেসরকারি কোনো চাকরির জন্য পড়ার চেষ্টা করছে। দুবছর কোনো রকমে সংসার টানতে পারলেও একদিন ডেকে বললেন, আর সম্ভব না। এই কোম্পানির উচ্চ মহলের কেউ আব্বার পরিচিত বলে, সেই সুপারিশে চাকরিটা হয়েছে। তাও ভালো, কিছু একটা তো হলো! কতমানুষের তো কোনো কিছুই হচ্ছে না।
সন্ধ্যা নামছে, জাহেদ উঠে দাঁড়ায়। এখান থেকে হেঁটে রাস্তা পার হয়ে বাসে উঠতে হবে, তারপর লেগুনায় ওঠার দৌড়। যে আগে উঠতে পারে।
জাহেদের হঠাত্ মনে হলো, ছেলেদের জীবনটাই একটা দৌড়। এই দৌড়ে সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কোথাও থামার জায়গা নেই, কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা নেই।
পথে কেউ সঙ্গীও নেই, পড়াশোনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সংসারের দায়িত্ব মাথায় চলে আসে। না কেউ চাপিয়ে দেয় না, এটাই নিয়ম। যে নিয়মে মেয়েদের দায়িত্ব বিয়ে দিয়ে শেষ করে বাবা মা। পুরুষদের ক্ষেত্রে বড় একচোখা নিয়ম! সে কাঁদতে পারবে না, সে থামতেও পারবে না! কারো একান্ত ভালোবাসা পেতে হলেও পকেটের সামর্থ্য থাকতে হবে!
এই দৌড়টা সব ছেলেদের একার।
