পুরাকীর্তি

শশী লজ

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:০৯

মুক্তাগাছার প্রতাপশালী জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে নয় একর জমির উপর দ্বিতল বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেন। সূর্যকান্ত তার পালকপুত্র মহারাজ শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে ভবনটির নামকরণ করেন শশীলজ। বাইজেন্টাইন ধাঁচের নির্মানশৈলীতে নির্মিত এই ভবনটি ক্রিস্টাল প্যালেস বা রংমহল নামেও পরিচিত ছিল। নান্দনিক এই ভবন বা প্রাসাদটি নির্মাণে জমিদার সূর্যকান্তের কোন কৃপণতা ছিল না। তিনি সেই সময়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে প্যারিস থেকে মিউজিক্যাল স্টেয়ারবঙ্ (পা রাখলে গান বাজে) এমন একটি যন্ত্র ভবনটিতে লাগিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে ২১শে জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে লালচে ইট আর হলুদে দেয়ালের এই ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সূর্যকান্ত ভীষণ ব্যথিত হন। পরবর্তীতে নবীন মহারাজা শশীকান্ত আচার্য সংস্কার কাজ করে ভবনটিকে করে তুলেন আরো বেশী অনিন্দ্যসুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন। শশীলজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬ টি গম্বুজ। এর ভিতরে রয়েছে ১৮ টি কক্ষ। এর মাঝে বাসগৃহ, বিশ্রামগৃহ, রঙ্গালয়, নাচঘর ও স্নানঘর উল্লেখযোগ্য। স্নানঘরের পাশে রয়েছে সুরঙ্গ। মনে করা হয়, এই সুরঙ্গ দিয়ে সরাসরি মুক্তাগাছা যাওয়ার পথ ছিল। ভবনের পাশে রয়েছে মার্বেল পাথরে বাঁধাই করা একটি পুকুরঘাট ও পদ্মবাগান। দ্বিতলা স্নানঘরে বসে রানী এ পুকুরের হাঁসের খেলা দেখতেন বলে কথিত আছে। শশীলজের মূল ভবনের পাশে রয়েছে মনোরম সবুজ বাগান। বাগানে দেখা মিলবে শ্বেত পাথরের ফোয়ারা। ফোয়ারার মাঝখানে রয়েছে গ্রীক দেবী ভোনাসের স্বল্পবসনে স্নানরত মর্মর মূর্তি। নির্মাণকালীন সময়ে এ মূর্তিটি সূদুর ইতালি থেকে আনা হয়েছিল। মুক্তাগাছা জমিদারের কীর্তি সম্বলিত এ দর্শনীয় প্রাসাদের বাগানে পাওয়া যাবে অর্জুন, বকুল, জামরুল, রাঁধাচূড়া, গোলাপ-কামিনী সহ নানা প্রজাতির গাছ। দেখা মিলবে অতিদুষ্প্রাপ্য নাঙ্গিলগাম গাছের। এই গাছটি তত্কালীন সময়ে হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহার হতো। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের রচিত বিটিভির বিখ্যাত ধারাবাহিক নাটক অয়োময়ের চিত্র ধারণ করা হয়েছে এই শশী লজে। স্থাপত্য শিল্পসমৃদ্ধ এই রাজবাড়িটি ১৯৫২ সালে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীতে ৬০ বছরের বেশী সময় পর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করার লক্ষ্যে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নেন।