কৃষি শিক্ষার বাতিঘর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:১০

ঐতিহাসিক সময়কালের কথাও যদি ধরি, তাহলে দেখা যায় যে, কৃষিই ছিল এদেশের মানুষের সিংহভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কৃষিকে অবলম্বন করেই আবর্তিত হয়েছে এই দেশের অর্থনীতি। বলা বাহুল্য, সে কারণে মানুষের সুখ-দুঃখ আর আনন্দ-বেদনার বিষয়টিও কৃষিকে ঘিরেই রচিত হয়েছিল। বরাবরই বড় কম চাহিদা ছিল এদেশের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর। দুবেলা দুমুঠো ভাত আর এক টুকরো কাপড়—এসবের সংস্থান করতেই কত কত মানুষের জীবন কেটে গেছে। বিদেশি শাসক-শোষকদের চাপে নিজের খাদ্যের সংস্থান করার জন্য খাদ্যশস্য উত্পাদনের বদলে তাদের শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য কত রকম শিল্পজাত ফসল অনিচ্ছায় ফলাতে হয়েছে এদেশের কৃষককে। দুবেলা দুমুঠো ভাত তাতে জোগাড় করতেই কষ্ট হতো। এর ওপর ছিল করের বোঝা। দিতে হতো কৃষককেই।

ব্রিটিশ আমলে উপর্যুপরি খাদ্যশস্যের উত্পাদন হ্রাস এবং পর্যায়ক্রমিক দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে কৃষি উন্নয়নের বিষয়ে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসকদের খানিক মনোযোগ আকর্ষিত হতো। এতে বিভিন্ন সময় দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষে কমিশন গঠন করত ইংরেজ সরকার। দীর্ঘ সময় নিয়ে তৈরি করা দুর্ভিক্ষ কমিশনের রিপোর্ট কখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রায়ই এসব রিপোর্ট বাক্সবন্দি হয়েই পড়ে থাকত। ১৯০১ সালে সংঘটিত একটি বড় দুর্ভিক্ষের পরে লর্ড কার্জন দুর্ভিক্ষ কমিশন গঠন করে। কমিশনের রিপোর্টে ভারতের কৃষি কার্যক্রম আরো সুসংহত, সম্প্রসারিত এবং যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরই ফলে ১৯০৫ সালে ইন্ডিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার সৃষ্টি করা হয় এবং ভাইসরয় অব ইন্ডিয়া লর্ড কার্জন বেঙ্গল ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করেন। ১৯০৮ সালে একটি কেন্দ্রীয় কৃষি গবেষণা ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয় এবং এরই সন্নিকটে ‘ঢাকা ফার্ম’ নামক ৪০৩ একর ভূমিবিশিষ্ট একটি গবেষণা খামার সৃষ্টি করা হয়। এ খামারের গেটকে বলা হতো ‘ফার্মগেট’ এবং সে খামার এলাকাটি এখন শেরেবাংলা নগর হিসেবে পরিচিত। একই সময়ে কৃষি ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ৩০০ একর জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সে ইনস্টিটিউট আর তখন স্থাপন করা হয়নি। ১৯২৭ সালে কৃষির সার্বিক উন্নয়নের ভাবনা নিয়ে বড় লাটের নির্দেশে লর্ড লিনলিথগোর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘রয়াল কমিশন অব এগ্রিকালচার’। ১৯২৯ সালে কমিশনের সুপারিশে ভারতের বিভিন্ন স্থানে কৃষি গবেষণাগার ও তত্সংলগ্ন কৃষি কলেজ/ইনস্টিটিউট স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়। সে রাজকীয় কৃষি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তেজগাঁও কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সংলগ্ন ৩০০ একর জমির ওপর স্থাপিত হয় ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। সেটি ছিল ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। ২০১৮ সালে এই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির আট দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলে এর নাম হয়েছে ‘পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ইনস্টিটিউট’, যা বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট’ তথা ‘বিএআই’ নাম ধারণ করে। বিএআই-এর সৃষ্টিলগ্ন থেকে এখানে তাত্ত্বিক ও বিশেষ করে হাতে কলমে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদীয় মর্যাদায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছরের বিএসসি (এজি) পাশ করার পর হাতে কলমে মাঠে ও গবেষণাগারে লেখাপড়া করার জন্য তখন বিএআইতে ভর্তি হতে হতো। প্রায়োগিক কৃষি কোর্স সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীগণ বিএজি ডিগ্রি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতেন। ১৯৪৩ সাল থেকেই গ্র্যাজুয়েটগণ এখান থেকে পাশ করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে শুরু করে। কৃষি রূপান্তরের সেটি ছিল আদিপর্ব। প্রতি বছর পাশ করা গ্র্যাজুয়েটগণের কর্মে যোগদান কৃষি কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কৃষির নানা শাখা-প্রশাখা তখন থেকে ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। স্বাধীনতা অব্যবহিত পূর্ব থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী কৃষি উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে অবকাঠামো-পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কর্মের বিস্তৃত পরিসর সৃষ্টির সব কর্মকাণ্ডে ‘বিএআই’-এর গ্র্যাজুয়েটগণই নেত্বতৃ দিয়েছেন। দেশব্যাপী কৃষি গবেষণা, কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের বৃহত্তর অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি সাধনের মাধ্যমে এদেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তা কৃষকের নিকট পৌঁছে দেওয়ার কাজ কিন্তু তাদের মাধ্যমেই শুরু হয় এবং এসবের নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকে দীর্ঘদিন।

কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কৃষকদের কাছে সরবরাহ করার জন্য আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের নানা রকম কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যান। এসবের পাশাপাশি এদেশের কৃষিক্ষেত্রের সফল উদ্যোক্তাও হয়েছেন অনেক গ্র্যাজুয়েট। তাদের হাত ধরেই এদেশে প্রাইভেট সেক্টরে বীজ কোম্পানি, রাসায়নিক কোম্পানিসহ নানা রকম প্রাইভেট কোম্পানির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাদের নেতৃত্বে কৃষিক্ষেত্রে প্রাইভেট কোম্পানির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। আর্থিক খাতেও এদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে আমাদের গ্র্যাজুয়েটগণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। কৃষি ব্যাংকসহ নানা রকম ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় তাদের অংশগ্রহণ এদেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ফসল কৃষির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা-উত্তর গত পাঁচ দশক ধরে আমাদের যে উল্লম্ফন ঘটেছে এর পেছনে নেপথ্যে যেসব কৃষিবিদ কাজ করেছেন তার নেতৃত্ব কিন্তু দিয়েছেন এখানকার গ্র্যাজুয়েটগণই।

সত্তর দশকের শেষের দিকে কৃষি অধিদপ্তর (গবেষণা ও শিক্ষা) রূপান্তরিত হয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। সেসময় একটি প্রশাসনিক আদেশে বিএআই-এর প্রশাসনিক দায়িত্ব বিএআরআই-এর ওপর ন্যস্ত হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইউ) সৃষ্টির পর এর একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ বিএইউ-এর ওপর ন্যস্ত হয় এবং বিএআই বিএইউ-এর একটি অধিভুক্ত ইনস্টিটিউটের মর্যাদায় অবনমিত হয়। দ্বৈত ব্যবস্থাপনায় বিএআই-এর প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাধীনতা ব্যাহত হয় এবং দিনে দিনে শিক্ষার ক্ষেত্রে এক রকম স্থবিরতা নেমে আসে। শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের মান উভয়টিই তখন হুমকির মুখে পড়ে।

নানা টানাপোড়েন আর দ্বৈতশাসন বিএআইকে দিনে দিনে সংকুচিত করে ফেলে। এদেশের কৃষি উন্নয়নে যে বৃহত্তর ভূমিকা বিএআই রেখেছিল দুই যুগ ধরে তা ক্রমশ মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়। এ ধারা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজারও কেউ ছিল না। সে দায়িত্ব যেমন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নেয়নি, নেয়নি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটও। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার পরিবর্তে এক রকম রেপ্লিকা শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৫১ সালে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রমও চালু হয়েছিল। যখন বিএআইকে শেরেবাংলা নগর থেকে সরিয়ে নেওয়ার গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তখন ১৯৮৫ সালে এখানকার স্নাতকোত্তর কোর্সের ভর্তি রহিত হয় এবং সে সময় গাজীপুরের সালনাতে চালু করা হয় স্নাতকোত্তর কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার’ তথা ইপশা। সেটি তখন কেবল স্নাতকোত্তর ইনস্টিটিউটই ছিল। লক্ষ্য ছিল বিএআইকে গাজীপুরের ইপশা ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা। নানা দিক থেকে আপত্তি ওঠায় বিএআই-কে স্থানচ্যুত করতে পারেনি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।

১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের বছরটিতেও আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯৫ ভাগ জনগোষ্ঠীর কর্ম আবর্তিত হয়েছে কৃষিকে অবলম্বন করে। সে সময় আমাদের জিডিপি শতকরা ৭৮ ভাগ আসত কৃষিজ উত্পাদন থেকেই। স্বাধীন দেশে কৃষিকে পুনর্গঠন করবার যে প্রয়াস বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন তা অসমাপ্ত থেকে যায় ঘাতকের হাতে তার নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। অবশেষে স্বাধীনতার ২৮ বছর পর তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে ২০০১ সালে ১৫ জুলাই ‘বিএআই’ ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’-এ রূপান্তরিত হয়। ‘বিএআই’-এর পিছিয়ে পড়া শিক্ষা কার্যক্রম এতে নতুন প্রাণ প্রায়। শুরু হয় সেমিস্টার সিস্টেমে কৃষিতে এর বিএসসি এজি কোর্স ২০০২ সালে, এমএসসি এজি ২০০৪ সালে এবং ২০১০ সালে এসে চালু করা হয় পিএইচডি কোর্স। কৃষি অনুষদভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদ চালু করা হয় সাধারণ কৃষিকে ব্যাবসায়িক কৃষিতে রূপান্তরের অভিপ্রায় নিয়ে। পরে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এই অনুষদ থেকে বিএসসি অর্থনীতি এবং বিবিএ (এগ্রিবিজনেস) নামক দুটো স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা হয়। পশুপালন এবং পশুচিকিত্সা এ দুটি ধারার সম্মিলিত রূপে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২ সালে অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের আওতায় বিএসসি ভেট. সায়েন্স অ্যান্ড এএইচ কোর্সটি চালু হয়। ফসল কৃষির প্রধানতম উপকরণ-বীজবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণাকে জোরদার করার জন্য ২০১২ সালে এখানে ‘ইনস্টিটিউট অব সিড টেকনোলজি’ নামক একটি স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়। দেশের সম্ভাবনাময় মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখার জন্য এখানে ২০১৭ সালে চালু করা হয় ফিশারিজ, একোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদ। এর আওতায় শুরু হয়েছে বিএসসি ইন ফিসারিজ কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৫টি বিভাগের মাধ্যমে চারটি অনুষদের আওতায় শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরু থেকে কোনো কোনো প্রশাসকের শৈথিল্য ও দূরদর্শিতার অভাবে বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ মান রক্ষা করতে না পারায় শিক্ষা কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শৈথিল্য এর গতিকে বেশ খানিকটা রুদ্ধ করেছে। ফলে এর অতীত ঐতিহ্যকে স্পর্শ করতে হলে প্রয়োজন হবে কিছু সংস্কার সাধন এবং দৃঢ় সংকল্প। এ সংকল্প দুজন/পাঁচ জনের নয়, সবার। বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে বেশ খানিক পরিবর্তনও। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে মেনে নেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে সবার।

n লেখক : ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।