দিনটি এলেই মন বিক্ষুব্ধ হয়

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:১১

১৬ জুলাই ২০০৭ সালের এই দিনে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০০৮-এর ১১ জুন দেশের আপামর জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৬ জুলাই ভোররাতেই যৌথ বাহিনী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাসভবন সুধাসদন ঘিরে ফেলে। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে নিম্ন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার পরপরই শেখ হাসিনাকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে নিয়ে বন্দি করে রাখা হয়। গ্রেপ্তারের আগে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি বানোয়াট দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। ঐ বিশেষ কারাগারের পাশেই সংসদ ভবন চত্বরে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করে তার বিচার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়ার প্রাক্কালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিক সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে যান। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার মুক্তি ও নির্বাচনের দাবিতে সংগঠিত হতে থাকেন। সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংগঠিত প্রতিবাদ করেন এবং ধীরে ধীরে আন্দোলন গড়ে তোলেন। কারাবন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিজেও বারবার দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। আইনজীবী ও চিকিত্সকেরা তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের মাধ্যমে তিনি দলকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে নেতাদের কাছে বার্তা পাঠান। কারা অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তার উন্নত চিকিত্সার জন্য জরুরি অবস্থার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে তাকে বিদেশে পাঠানোর দাবি ওঠে। একপর্যায়ে উন্নত চিকিত্সার প্রয়োজনে ২০০৮ সালের ১১ জুন ৮ সপ্তাহের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয় আওয়ামী লীগরে কারাবন্দি সভাপতি শেখ হাসিনাকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা চিকিত্সার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান।

আসলে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে খুন করার সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার সংগ্রামী জীবনে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে দুঃখের কষ্টিপাথরে সহিষ্ণুতার দীক্ষায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে। ’৭৫ থেকে ’৯৫ দীর্ঘ ২১ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। তারপর ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অমানিশার দুর্যোগে প্রাণ বাঁচানোর দুঃসহ স্মৃতি; অর্থাত্ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া জীবন নিয়ে আবার নির্যাতিত জনগণের জন্য রাতদিনের পরিশ্রম, কিন্তু ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারাগারে বন্দি হলেন; শুরু হলো আরেক জীবন। সেই জীবনের স্মৃতি আছে তার রচনায়, ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ গ্রন্থে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল চাঁদাবাজির। অথচ ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতাকালে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হলেও কখনো চাদাবাজির মামলা করা হয়নি। ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার জন্য শেখ হাসিনা আন্দোলন করেছিলেন। ৬৮ জন জীবন দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী ও পুলিশের হাতে। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। চারদলীয় জোটের ভোট কারচুপির নীলনকশা প্রতিহত করার জন্যই আন্দোলন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করাও তার মূল টার্গেট ছিল। নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আন্দোলন করে দাবি পূরণ করলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করলাম। যেই দ্রুত নির্বাচনের কথা বললাম, সেই আমি চাঁদাবাজ হয়ে গেলাম, দুর্নীতিবাজ হয়ে গেলাম। আমার স্থান হলো কারাগারে। পাঁচটি বছর চারদলীয় জোট তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে আমার ও আমার পরিবারের দুর্নীতির কোন কিছু পায় কি না, পায় নাই। পেয়েছে ফখরুদ্দীন সরকার।’

চাঁদাবাজির মামলাগুলো কীভাবে করা হয়েছিল, তা-ও তিনি জানতেন। গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত করার চেষ্টাকে চিরতরে বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল যারা, তারা গোপনে ষড়যন্ত্র করে মানুষকে সামরিক শাসন উপহার দিতে চেয়েছিল। ২০০৭ সালে প্রথমে সশস্ত্র বাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে দুই বছর পর নির্বাচন হবে। সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। অথচ তখন নতুন নতুন দল গঠন করা হচ্ছিল। মাইনাস টু অনুসারে, যা ছিল আসলে ‘মাইনাস শেখ হাসিনা’—তৃতীয় শক্তির উত্থান প্রত্যাশা করেছিলেন তখনকার শাসকেরা।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৯টি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছয়টি—মোট ১৫টি মামলা করা হয়। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে ‘দুদক’কে ব্যবহার করে। ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর বিদেশি প্রতিষ্ঠান নাইকোকে অবৈধভাবে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ এনে শেখ হাসিনাসহ সাত জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করে ‘দুদক’। ২০০৮ সালের ৫ মে এ মামলায় ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলার দায় থেকে অব্যাহতির জন্য শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে হাইকোর্টে আবেদন করলে ৭ জুলাই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করে। এই রুলের ওপর শুনানি শেষে আদালত মামলাটি বাতিল ঘোষণা করে। এভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা সব মামলার পরিসমাপ্তি ঘটে।

২০০৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নাটকীয় ঘটনার জন্ম হয়েছে। সে সময় ‘দুদকের’ দৌড়ঝাঁপ, ‘মাইনাস টু’র কুশিলবদের উচ্চস্বর ও দাম্ভিকতা, বিচারকদের অসহায়ত্ব আর শেখ হাসিনার জন্য জনগণের বেদনাবোধ অন্যান্য দেশের মানুষকে আলোড়িত করেছিল। শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য দেশ-বিদেশে যে জোরাল দাবি উঠেছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব। একই সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করে উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কারামুক্ত হয়ে তিনি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চেয়েছিলেন। একটা সুন্দর ও নিরাপদ জীবন উপহার দেবেন—এটা তাঁর এখনকারও অঙ্গীকার।

n লেখক :ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়