এ গন্ধ আমাদের চেনা

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:১১

যার পরিচয় শ্রমিক, বৈষম্যের রাষ্ট্রে, বিভাজনের সমাজে, শোষণের কর্মক্ষেত্রে তিনি আসলে বেঁচেই থাকেন না; প্রাণবিক আয়ু নিয়ে চলাফেরা করেন মাত্র। রূপগঞ্জে হাশেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় ‘মানবিক জীবনশূন্য’ অর্ধশতাধিক শ্রমিকের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়ায় তাদের প্রাণবিক মৃত্যু ঘটে; জীবনের স্বাভাবিক পরিণতির ‘শেষবিদায়’ ঘটে না। মানুষের ন্যূনতম অধিকার-সম্মান যোগ হয় না যে জীবনে, সে জীবন তো অযথা খরচেরই; খোলামকুচির মতো অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলার। যার আলাদা পরিচয় নেই সমাজে, মরণেও তার সমানভাবে পরিচয়হীন থাকাই দস্তুর। বেঁচে থাকতে যে ‘মানুষের’ জীবন পায়নি, মানুষের মতো বিদায় তার প্রাপ্য হবে কেন? ওরা তাই কেবল ‘সংখ্যা’। পোড়া মাংসের দলা।

২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে পুড়ে ছাই হয়েছিল শতাধিক শ্রমিক। তাদের পোড়া গন্ধ তখনো নাকে লেগেছিল বটে, তবে তা ‘রুমাল’ দিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়া গেছে। তাজরীনের মালিক জামিন নিয়ে বিদেশে বহাল তবিয়তে আছেন। নিহত শ্রমিকদের পরিবার, আহত শ্রমিকেরা ক্ষতিপূরণ, প্রাপ্য কিছুই পাননি। ফলে ‘দ্বিতীয় তাজরীন’ ঘটা অনিবার্যই হয়ে ওঠে! মালিকের লাভের লালসা আর কর্তৃপক্ষের উপেক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থাই বলবত্। কারখানায় যথাযথ অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা থাকবে না, অবকাঠামোর আকার-আয়তন অনুযায়ী যতগুলো সিঁড়ি, প্রবেশপথ বা জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা থাকা দরকার, থাকবে না এবং ঘটনার সময়ও ‘নিরাপত্তাই প্রথম’ মন্ত্রে দীক্ষিত কারাখানা কর্তৃপক্ষ সদর দরজা থেকে শুরু করে সব ফাঁকফোকর বন্ধ করে দেবে! 

২০০৫ সালে সাভারে স্পেকট্রাম সোয়েটার ফ্যাক্টরির ভবনধসে প্রাণ হারান ৬২ জন শ্রমিক। আহত হন অনেকে। নিহতের পরিবার ও আহতরা প্রতিশ্রুত টাকাপয়সার কতটা পেয়েছে? এরপর কেটিএসএ-হামীম-তাজরীন হয়ে রানা প্লাজা। হাজার শ্রমিক বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন। ন্যাংড়া, খোঁড়া, নুলা হয়ে দুর্বিষহ জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন কত মানুষ, তার খোঁজ মালিকপক্ষ তো রাখেইনি, রাষ্ট্রেরও অজানা।

রূপগঞ্জের ঘটনায়ও যারা ভাঙা-বিকল-পোড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে হূদস্পন্দন সচল রাখার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালে, তাদের সামনে জীবন কি ভিন্ন কিছু নিয়ে অপেক্ষা করবে? এতদিনের ‘ঐতিহ্য’ সেই ভরসা জোগায় না।

২০১০ সালে নিমতলী থেকে গত বছর চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের মধ্যের সময় প্রায় ৯ বছর। নিমতলীর ঘটনার তদন্ত কমিটির দেওয়া ১৭টি সুপারিশের প্রথমটিই ছিল রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়া। গুদাম বা কারখানা সরেছে? সরেনি। যেহেতু সরেনি, অতএব অপঘাত মৃত্যুর ঝুঁকিও কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ। বলাই বাহুল্য, সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল শিল্প, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর এবং সিটি করপোরেশনের।

নিমতলী, চুড়িহাট্টা, জাপান গার্ডেন, বনানী, আরমানিটোলা—একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে মানুষ মরেছে! গত বছরের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ শেষে গ্যাসের ছিদ্র থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রার্থনারত মুসল্লি, পথচারীসহ পুড়ে মারা যান ৩৭ জন। কয়েক দিন আগেই মগবাজারে একটি ভবনে বিস্ফোরণে বেঘোরে প্রাণ হারালেন ১০ জন। জমাট গ্যাস থেকেই এই বিস্ফোরণ বলে আলামত মিলছে। অথচ  ঘটনার দিনই তিতাস কর্তৃপক্ষ হাত ধুয়ে নিল।  না, না, ঐ ভবন কেন, পাশের দুটোতেও তাদের কোনো সংযোগ নেই!

কর্তৃপক্ষ হোক সরকারি বা বেসরকারি—উভয়েরই ‘দায়মুক্তি’ ভোগের সব পথঘাট চেনা। আইনশৃঙ্খলা যখন খাতা-কলমে, তখন সে দেশে দিনদুপুরে ‘খুন’ না হয়ে যায় না। অতএব এসবই যখন ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত, অপঘাত মৃত্যু তখন ‘নিয়তি’ই হয়ে দাঁড়ায়।

দেশে এক দিনে করোনায় ২১২ জনের মৃত্যুর দিনে, ৫২ জন শ্রমিকের পুড়ে ছাই হওয়া, সংখ্যা বিবেচনায় বড় নয়! করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলেও তো তাদের অক্সিজেন সংকটে প্রাণ যেতে পারত! আগুনেও অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়, বন্ধ হয় নিঃশ্বাস, সঙ্গে পুড়ে যায় শরীর। প্রাণহীন শরীর পোড়া বা না পোড়ায় কী এমন ফারাক, যখন তা নিতান্তই সংখ্যা!

তবু মনে পড়ে, এইসব খরচযোগ্য মেহনতি মানুষের রক্ত জল করা শ্রমে কলকারখানার কলেবর বাড়ে; শিল্পের বিকাশ ঘটে। তেজি ঘোড়ার মতো ছোটে অর্থনীতি। তার পিঠে সওয়ার দেশের হাসিমুখের বিজ্ঞাপন দেখে বিশ্ব।

n লেখক :সাংবাদিক