পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২১, ২২:৪০

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের হত্যা হয়েছে। ?আইনের শাসনের পরিবর্তে সেখানে শাসকের আইন চলছে। পরিস্থিতি না বদলালে গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে। ছড়িয়ে পড়বে অন্য রাজ্যেও। কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্দলের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চে জমা দেওয়া রিপোর্টে এ কথা বলেছে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।  গত ১৩ জুলাই জমা দেওয়া কমিশনের সাত সদস্যের ৫০ পৃষ্ঠার রিপোর্টে দাগি দুষ্কৃতকারীদের তালিকায় রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রীসহ একাধিক এমএলএ’র নাম। এ নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ?পশ্চিমবঙ্গের দুর্নাম করতে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তথ্য বিকৃত করা হচ্ছে। উত্তর প্রদেশে আইনের শাসন নেই। সেখানে কয়টা কমিশন পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার?? মমতা বলেন, রাজ্য প্রশাসনের বক্তব্য না শুনেই এই রিপোর্ট তৈরি করেছে কমিশন। আমাদের বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও হলফনামা পেশ করার সুযোগ দেবে আদালত। আর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায়িত্বে তখন নির্বাচন কমিশনের ছিল। আমি আর কিছু বলতে চাই না।?

ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ?গত ২ মে থেকে ২০ জুনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন থানায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সংক্রান্ত ১ হাজার ৯৩৪টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৯টি খুন, ১২টি ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতন এবং ৯৪০টি লুটের অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ৯ হাজার ৩০৪ জনের নাম অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৪৫ জনকে। ১ হাজার ৮৬ জন জামিনে মুক্ত রয়েছেন।?

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষের ওপর এই রকম নৃশংস অত্যাচার, খুন, ধর্ষণের ঘটনা অকল্পনীয়। অথচ সহিংসতার ঘটনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের মুখ খুলতে দেখা যায়নি। দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের জীবনের অধিকার, বাক্?স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলেও প্রশাসনকে এই বিষয় নিয়ে? উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার পিছনে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং অপরাধ জগতের যোগসূত্র রয়েছে।?

মানবাধিকার কমিশন এসব ঘটনায় সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে সিট গঠন এবং মামলার সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে জরুরি। বিশেষ সরকারি আইনজীবীদের নিযুক্ত করার পক্ষেও মত দিয়েছে কমিশন। এছাড়াও সহিংসতার ঘটনার শিকার হয়েছেন যারা, তাদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আর্জি জানিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি ‘দায়ী’ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করারও দাবি জানানো হয়েছে রিপোর্টে।

কলকাতা হাইকোর্টে কমিশনের দেওয়া রিপোর্টে ‘দুষ্কৃতি’র তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, এমএলএ পার্থ ভৌমিক, শওকত মোল্লা, জীবন সাহা, খোকন দাসের নাম রয়েছে। আছে উদয়ন গুহ, নন্দীগ্রামের তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ানের নামও। এ প্রসঙ্গে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ?এ রিপোর্ট খুবই দুঃখজনক, লজ্জাজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি সম্পূর্ণ সাজানো রিপোর্ট। দল এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।? তৃণমূল নেতারা বলেছেন, ভোটে হার মেনে নিতে না পেরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে বিজেপি।

মমতা ব্যানার্জি বলেন, রিপোর্টটি এখনো দেখিনি। তবে বিষয়টি বিচারাধীন, তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বলব না। তবে বিকৃত রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। এমনকি কারা রিপোর্ট দিয়েছে, তাদের পরিচয় জানি, কিন্তু বলব না। ভোটে হেরে পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বদনাম করার চেষ্টা চলছে। হারের পরেও লজ্জা নেই, কিছুতেই হার মানতে পারছে না। উত্তর প্রদেশে আইনের কোনো শাসন নেই, পবিত্র গঙ্গা দিয়ে মৃতদেহ পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে, বিহারে গিয়ে খোঁজ নিন কত মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। সেখানে মানবাধিকার কমিশনের কয়টা প্রতিনিধিদল গেছে।