সহায়তা করিবার সৌভাগ্য সকলের হয় না

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২১, ২১:২৬

একটি বিখ্যাত ভারতীয় প্রবচন আছে যে, ‘তুমি অন্যকে দান করিতে পারিতেছ, তাহা অন্যের সৌভাগ্য নহে, তাহা তোমারই সৌভাগ্য। কারণ ঈশ্বর তোমাকে দান করিবার সামর্থ্য প্রদান করিয়াছে।’ প্রথম বিশ্বের কল্যাণকর দেশসমূহের অনেক বড় ধনীর মানবকল্যাণমূলক কাজ আমাদের নিকট বিস্ময় জাগায়। মনে প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশেও তো কিছু ধনী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী রহিয়াছেন—তাহাদের মধ্যে কেন মানবতার সূর্য উদিত হয় না? আমরা তো সৃষ্টির সেরা জীব। আমরা কেন তাহার প্রমাণ নিজেদের জীবনাচরণে রাখি না? প্রকৃতপক্ষে করোনা মহামারিতে সেই লিটমাস পেপারের পরীক্ষা দিতে হইয়াছে আমাদের দেশের ধনীদের। আনন্দের সহিত বলিতে হয়, সেই পরীক্ষায় আমরা লেটার মার্কস না পাইলেও ফেল করি নাই। দেশের প্রান্তিক জনপদে করোনার লকডাউনে কর্মহীন অসহায় দুস্থ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করিয়া চলিতেছেন অনেক মানবদরদি। ইহাদের মধ্যে ব্যবসায়ী শিল্পপতি হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিরাও রহিয়াছেন। বলা যায়, আমাদের দেশের ধনীদের মধ্যেও মানবতার নূতন আলোর রোশনাই ঝিলিক দিতেছে। কিছুটা হইলেও দূর করিতেছে দুস্থদের অসহায়ত্বের অন্ধকার। যাহাদের ঘরে উনুন জ্বলে নাই, যাহারা  অতিমারিতে কাজ হারাইয়া দিশাহারা, ধারদেনা করিয়া যাহারা অকূল পাথারে পড়িয়াছেন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গিয়াছে যাহাদের, তাহাদের এই কষ্টপথে সারথি হইয়াছে দেশের বেশ কিছু ধনী ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠী। শিল্পগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, এ কে খান গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ ইত্যাদির মতো বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী রহিয়াছে। ত্রাণ ও খাদ্যসহায়তা লইয়া অসহায় দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াইয়াছে এই সকল প্রতিষ্ঠান। অনেকেই বলিতে পারেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা একেবারেই অপ্রতুল। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, বিন্দু বিন্দু দিয়াই সিন্ধু তৈরি হয়। সুতরাং কোনো সহায়তাই অপ্রতুল নহে।

আমরা দেখিতে পাইতেছি, করোনার একের পর এক ঢেউয়ে ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, শিল্পকারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকিবার কারণে সারা বিশ্বেই বেকার মানুষের সংখ্যা এত অধিক বৃদ্ধি পাইয়াছে যে, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশকেও তাহা সামাল দিতে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইতেছে। এই ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলির সমস্যা যে আরো প্রকট আকার ধারণ করিয়াছে, চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেই তাহার শত-সহস  জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত দেখিতে পাওয়া যায়। স্বস্তির সহিত আমরা দেখিয়াছি, মহামারির এই সোয়া এক বত্সরে বিশ্বের সেরা ধনীদের অনেকেই দুই হাত উজাড় করিয়া দান করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বোজেস, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গসহ অসংখ্য ধনী ব্যক্তি রহিয়াছেন। বিপুল আর্থিক সাহায্য দিয়াছেন এশিয়ার সবচেয়ে ধনী পরিবার মুকেশ আম্বানির সংস্থা রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং রিলায়্যান্স ফাউন্ডেশন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি আজিম প্রেমজি তাহার সম্পদের একটি বিরাট অংশ করোনাকালীন অসহায় মানুষের সেবায় বণ্টন করিয়া দিয়াছেন। সেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্পীরা ট্রাক ট্রাক ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন মানুষের দোরগোড়ায়। খেলাধুলার মধ্যে মেসি-নেইমারসহ অনেক ধনী ফুটবলাররাই আগাইয়া আসিয়াছেন।

মহান সৃষ্টিকর্তা জ্ঞান, বুদ্ধি, বিদ্যা প্রভৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সঠিক কাজটি করিবার জন্য আমাদের বিবেক দিয়াছেন। আমরা যেন ভুলিয়া না যাই, আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে আমাদের মহান আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠাইয়াছেন। সুতরাং সেরা জীবের প্রতিচ্ছাপ আমাদের প্রতিটি কর্মের মধ্যে থাকিতে হইবে। যাহারা ধনবান, তাহাদের দায়িত্ব আরো অধিক, কারণ সৃষ্টিকর্তার অপার করুণার মাধ্যমেই তাহারা ধনসম্পদের মালিক হইয়াছেন। সৃষ্টিকর্তা অপার করুণাময়। সুতরাং অন্যকে সাহায্য করিবার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তারই ইবাদত করা হয়। অন্যকে সহায়তা করিবার সৌভাগ্য সকলের হয় না। ইহাকে সামর্থ্যবানদের কাজে লাগাইতে হইবে। ইহার তুল্য পুণ্য কাজ আর কী আছে?