‘শৌ’ শেষ হলো।
‘কর্নওয়ালে’ এসে ম্যাক্রনের মনে ফুরফুরে ভাব :পারিবারিক গেট-টুগেদার করছেন, পুরোনো দিনের পরিচিতদের দেখে আনন্দ হচ্ছে; জনসনকে : অনেকদিন বাদে ‘স্কুলে ফিরে আসার’ কথা মনে করিয়ে দিল। জনসনেরও আহ্লাদের শেষ নেই; বাইডেনের সঙ্গে সদ্য সই করা ‘নিউ আটলান্টিক চার্টারে’র দলিলটির বদৌলতে ‘ব্রেক্সিস্ট যুক্তরাজ্য’ এখন ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’! ‘পুব থেকে ধেয়ে আসছে হুমকির আতঙ্ক’। তাকে ঠেকাতেই হবে; তাই ‘ওয়েস্ট ইজ ব্যাক’।
বিভক্ত ‘জি৭’ সরকারি ইশতাহার দিয়েছে, ভিত্তিপ্রস্তর হলো :‘আমাদের মূল্যবোধ বা শেয়ার্ড ভ্যালিউজ’; চীনকে ‘মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাগুলোকে’ লালনপালনের কথা বলা হয়েছে, বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে ‘শিনজিয়াং ও হংকং’। চমকপ্রদ যে ‘জি৭’-এর একটা অংশ ‘শিনজিয়াং’ ও ‘হংকং’কে নিয়ে মহা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত! ‘শিনজিয়াং’-এর কথাই ধরা যাক। সত্যি বটে যে সর্ববর্ণমিশ্রিত বহুজাতিভিত্তিক ‘গলাকাটা জিহাদি দলে’ উইঘুরদের কেউ কেউ নাম লিখিয়েছিল; রপ্তানিযোগ্য পণ্য উত্পাদনের শহর শিনজিয়াংকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ আখ্যা দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে—শিনজিয়াংকে ফিলিস্তিনিদের গাজা নামক ভূখণ্ডে বিদ্যমান ‘ওপেন স্কাই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে’র সঙ্গে অসম তুলনা না করে নিজেই বরং ‘কিয়াও কালেকটিভ/qiao collective গুগল করুন। তাছাড়াও, চীনের উত্তর-পূর্বাংশে শিনজিয়াংয়ের মাটির গভীরে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো পরিমাণ তেল ও গ্যাস নামক কৃষ্ণস্বর্ণ পাওয়া গেছে। আর হংকং প্রসঙ্গে নতুন করে কিছু বলবার নেই। দু-দুটো আফিম যুদ্ধ ও নির্মমভাবে বক্সার আন্দোলনের রক্তাক্ত সমাপ্তি ঘটানোর পরে হংকং পশ্চিমের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যবন্দরে পরিণত হয়। প্রায় দেড় শ বছর বাদে, এই সময়সীমার মধ্যে সেখানে কোনোদিন স্থানীয় নির্বাচন পর্যন্ত হয়নি, যুক্তরাজ্য চীনের ভূখণ্ড চীনকে ফেরত দেয়।
তারপরে, বিভক্ত ‘জি৭’-চীনের ‘অভিনব সিল্ক-রোড’ বা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর (বিআরআই) পালটা ব্যবস্থা হিসেবে :এসো, পৃথিবীকে ভালোতরভাবে গড়ি তথা ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড’ বা বি৩ডব্লিউ নামক প্রজেক্টের কথা বলে।
বছর আটেক পূর্বে প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রজেক্টের ঘোষণা দেন, পরে নাম বদলে হয় বিআরআই। কয়েক বছর পূর্বে এই ‘অভিনব সিল্ক-রোড’ নিয়ে লেখা আমার একাধিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ইত্তেফাকের পাঠকরা সুপরিচিত। আমাদের মনে আছে যে শি-এর ঘোষণার পরপরই পশ্চিম হয় প্রজেক্টটিকে গ্রাহ্যের মধ্যে নেয়নি আর নয়তো প্রজেক্টটির নন-স্টপ নিন্দায় ব্যস্ত থাকে। অতঃপর, প্রায় আট বছর বাদে, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডে’র সক্রিয়—বৃহদাকারের অন্তঃমহাদেশীয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর বিকল্প হিসেবে পশ্চিম সহসা ‘বি৩ডব্লিউ’র প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ‘বিআরআই’ প্রজেক্টের স্থূল অনুকরণ থেকে সুস্পষ্ট যে আসল উদ্দেশ্য হলো—চীনকে বাধা দাও, দমন করো। বিশ্বকে ‘আমাদের মূল্যবোধ তথা শেয়ার্ড-মূল্যবোধ বনাম স্বেচ্ছাতন্ত্র/ওটক্রেসি’তে বিভক্ত করে—মাঝখানে ‘মুলা’ (পশ্চিম গোলার্ধে বলে ‘গাজর’) ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে; কেউ যদি লুফে নেয়! গ্লোবাল সাউথের কম করে ১৫০টি দেশ, যাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে কড়া ডোজের ঔপনিবেশিক ইতিহাস—অজস্র শ্রুতিমধুর উক্তি ও প্রতিশ্রুতির মোড়কে প্যাঁচানো অস্পষ্ট ‘বি৩ডব্লিউ’ প্রজেক্টের ঘোষণায় চমত্কৃত হওয়ার মতো উপাদান পেয়েছে বইকি!
বাস্তব সত্য হলো যে চীনের ‘অভিনব সিল্ক রোড’ ওরফে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রজেক্টের কারণ খুঁজলে আমাদের গত শতাব্দীর ঠান্ডা যুদ্ধের দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ‘জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে’ (সংক্ষেপে NAM, বা ‘নাম’) ফিরে যেতে হয়। ‘নামে’ নেহরু, মার্শাল টিটোসহ বলিষ্ঠ স্থিরপ্রতিজ্ঞ আরো লিডার ছিলেন, মাও জেদুংয়ের চীনও ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিনগুলোতে—ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে—ঠান্ডা যুদ্ধের খপ্পর থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে চীন ‘নাম’-এর আওতায় স্থিরপ্রতিজ্ঞের ভূমিকা নেয়। ‘নাম’ এখনো তার বলিষ্ঠ অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। (মাও জেদুংয়ের ‘থ্রি ওয়ার্ল্ড থিয়োরি’ গুগল করে দেখুন)। পৃথিবীর এইসব অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেককালের, এসব দেশ চীনের আচরণের সঙ্গে সুপরিচিত।
দীর্ঘপথ অতিক্রম করে চীন আজকের অবস্থায় এসেছে, এবং এর জন্য সে কারো কাছে কানাপয়সাও ঋণী নয়; বিশেষ করে, সেসব দেশের কাছে তো নয়ই, যারা বিংশ শতাব্দীর সূচনায় (এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যে অ্যাংলো-আমেরিকান মৈত্রীজোট চীনের অসামরিক জনসমষ্টির ওপর নাপাম ও মাস্টার্ড বোমার বোমাবৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধী) চীনকে ধ্বংস করতে দ্বিধা করেনি।
‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রজেক্টের মাধ্যমে চীন গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে; গ্লোবাল সাউথও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল/বিশ্বব্যাংকসহ দাতা দেশগুলোর কাছে দায়বদ্ধ থাকা কমাতে পারছে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গেও চীন ব্যবসায়-বাণিজ্য করছে। ইইউর যেসব দেশের অর্থনীতি উত্পাদনভিত্তিক এবং গ্লোবাল সাউথ যাদের পণ্য কিনতে চায়, যেমন : জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, সেসব দেশ চীনের বিনিয়োগপ্রার্থী। চীনের অভিপ্রায় ব্যবসায়-বাণিজ্য করা, ইইউর এক নম্বর বিজনেস পার্টনার চীন। তবে চীন যেমন অপেক্ষা করতে জানে তেমনি বিভিন্ন দেশের/জনসমষ্টির সঙ্গে ‘কমন ভ্যালিউজে’র ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাসী, ‘শেয়ার্ড ভ্যালিউজ’-এর ভিত্তিতে নয়। মূল্যবোধের প্রশ্নে চীন ও রাশিয়া পশ্চিমের পিরামিড আকৃতির সংগঠনভিত্তিক প্রাধান্যপরম্পরাগত মূল্যবোধকে—অর্থাত্, প্রত্যেক জাতির জাতিগত স্পেসিফিক বৈশিষ্ট্যসমূহ ‘শেয়ার্ড ভ্যালিউজে’র সমুদ্রে হারিয়ে যায়—তাই স্বীকার করে না।
আহ্ আ! আটাশ বছরের জীবনে ‘জি৭’-এর : ‘ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত’ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একটা ব্যবস্থা করা ও ‘বি৩ডব্লিউ’ জাতীয় প্রজেক্ট দাঁড় করাতে খেয়াল হয়নি! কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন অনড়! ‘আমাদের মূল্যবোধ’ ও ‘আমাদের গণতন্ত্র’ তাড়িত পশ্চিম! ‘বি৩ডব্লিউ’ প্রজেক্ট করতেই হবে! ’অনুঘটক বিনিয়োগের’ ব্যবস্থা আসবে বিভিন্ন ‘ডেভেলপমেন্ট সংস্থা’ থেকে; এবং চারটি প্রধান ক্ষেত্র : জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও জেন্ডার-সাম্যতাকে কেন্দ্র করে প্রাইভেট-সেক্টরের পুঁজিকে মবিলাইজ করা হবে। অর্থাত্ আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের/বিশ্বব্যাংকের মঞ্জুরিকে প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত হবে; ‘আমাদের মূল্যবোধসমূহ’ সংরক্ষণের খাতিরে এমন উদীয়মান দেশগুলোই চান্স পাবে, যারা দ্রুত ও সহজ মুনাফা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেবে, কারণ ‘লস’ খেতে হলে কোনো প্রাইভেট বিনিয়োগকারীকে পাওয়া যাবে না।
ন্যাটোর ঘোষণায় রাশিয়ার পদোন্নতি ঘটিয়ে ‘অ্যাকিউট থ্রেট’ করা হয়েছে, ‘রাশিয়া’ তেষট্টি বার ব্যবহার হয়েছে। রাশিয়া প্রশ্নে ন্যাটোকে ফ্রি-হ্যান্ড দেওয়া হয়েছে; জেনস স্টোলটেনবার্গ নিশ্চয় পূর্ব ইউরোপের রুশোফোবদের কাছে কৃতজ্ঞ। প্রয়োজনে উত্তর আটলান্টিকের জলরাশি ত্যাগ করে ন্যাটো ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগরসহ বিশ্বের যে কোনো জলরাশিতে ঢুুকবে। রাশিয়াকে নিয়ে ন্যাটো কী খেলা দেখাবে, দেখা যাক। কারণ, ২০১৮ সালে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ‘সুপারসনিক ট্র্যাজেকটাইল’ তথা ‘অ্যাভান-গার্ড প্রজেক্টের’ সংযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মেগা-পারমাণবিক ভান্ডারকে অবান্তর অপ্রাঙ্গিক করে দিয়েছে (বিস্তারিত জানতে আমার ‘আন্তর্জাতিক সমস্যা ও সমকালীন বিশ্বরাজনীতি’ দেখুন)। ন্যাটোর কাছে চীন ‘সিসেটমিক চ্যালেঞ্জ’, ঘোষণায় মাত্র ১০ বার ‘চীন’ ব্যবহার হয়েছে। অবশ্য চীনকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকার দায়িত্ব নিয়েছে বিভক্ত জি৭।
অতএব, দেখা যাক, শিংজিয়াং ও হংকংয়ের ‘মানবাধিকার ভঙ্গের’ জন্য এবং তাইওয়ানের অটোনমির পক্ষে, এক হস্তে—ইউরোপ চীনকে সাফল্যের সঙ্গে কীভাবে কঠোর শাস্তি দেয়, এবং অন্য হস্তে ইউরোপের বিখণ্ডায়নরত অর্থনীতির জন্য চীনের সাহায্যপ্রার্থী হয়।
n লেখক: আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
