কদিন বাদে আসিয়ার বিয়ে। কিন্তু বিয়ে নিয়ে আনন্দের চেয়ে আসিয়া অনেক বেশি বিষণ্ন তার বাবার কথা চিন্তা করে। তাদের মধ্যবিত্ত জীবনে বর আকবরের পরিবারের যৌতুক-চাহিদা অনেক। আলাপের ছলে আকবরের মামা বলছেন, ‘যৌতুক চাওয়া অন্যায় কিন্তু আপনার মেয়েকে গিফট দিয়ে ঘর সাজিয়ে দিলে সেটা কি আমরা মানা করতে পারি? আর আকবরের পরিবারে প্রথম বিয়ে এটা। তাই বিয়ের আয়োজনটা জমকালো হবে—এই আমাদের চাওয়া।’
কুমিল্লার তেলিকোনার মেয়ে আসিয়ার গল্পটা এখন এ সমাজের নিত্যদিনের ঘটনা। যৌতুক প্রথার শুধু নাম বদল হয়েছে। উচ্চবিত্তরা বিয়ের সময় গিফট দিয়ে মেয়েকে পাঠায় শ্বশুরবাড়ি। আর নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সে ‘গিফট’ বা উপহার দেওয়ার উছিলায় যৌতুক নেয়। যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার ধরনটা শুধু বদলেছে। যৌতুক ছাড়া বিয়ে হয় না, এখনো সমাজে এটাই সত্যি। তাই ধনীদের কাছে যা উপহার, গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার কাছে সেটা বোঝা।
দেশের বর্তমান যৌতুক নিরোধ আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো নারীর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষের অন্য যে কোনো ব্যক্তি যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
কিন্তু কঠোর এ আইনকে উপেক্ষা করে সমাজে যৌতুকের বলি হচ্ছেন নারীরা প্রতিনিয়ত। ইউএনডিপি পরিচালিত ‘সিস্টেম অব ডাওরি ইন বাংলাদেশ’ নামের ১০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘বাংলাদেশে শতকরা ৬০ শতাংশ বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।’
সরাসরি যৌতুক হিসেবে নগদ বা অন্য দাবিদাওয়া সবার বেলাতে না থাকলে মেয়েকে ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে থালাবাসন সবই দিতে হয় বাবার বাড়ি থেকে। তার সঙ্গে পাত্রের বোনজামাইদের দিতে হয় সোনার আংটি মেয়েপক্ষ থেকে। সেক্ষেত্রে বোনজামাই যে কজন থাকবে তাদের সবাইকে দিতে হবে আংটি।
বিয়েতে বরপক্ষকে আপ্যায়নেও একটা অদ্ভুত বিষয় দেখা যায়। যেমন, মেয়েপক্ষকে বলা হলো বরপক্ষের ৩০০ জনের জায়গাতে ১৫০ আসবে। বাকিরা না এলেও তাদের আপ্যায়ন করবে ছেলেপক্ষ নিজেদের বাড়িতে। আর এ আপ্যায়নের খরচ হিসাব করে মেয়ের বাবাকে টাকাটা ছেলেপক্ষকে দিতে হবে। কী অদ্ভুত কথা!
কিছুই পরিবর্তন হয়নি। বরং আইনি জটিলতা এড়াতে যৌতুকের লেনদেন সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আজকাল আর সাক্ষী থাকে না। এমনকি বিয়ের কোনো কাগজপত্রে যৌতুকের বিষয় উল্লেখ করা হয় না। ‘গিফট’ দেওয়ার নামে আসিয়ার মতো মেয়েরা যখন বাবার অসহায়ত্বের অশ্রু নিয়ে সংসার শুরু করে, তখন তার কাছে বিয়েটা আনন্দের হয় না। আবার নানা যুক্তি বাহানা দিয়ে মেয়ের বাবার টাকাতে ছেলে বিয়ে করছে, এ সত্যটা স্বীকার করতে আকবরের মতো ছেলেদের আত্মসম্মানে বাধে।
এ অবস্থায় সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির গিফটের বিলাসিতা মধ্য নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে প্রভাবিত করছে। আর তাই গিফটকে যৌতুক জেনেও একজন পিতা বা মা বলতে পারেন না, ‘যৌতুক দিয়ে কন্যাকে বিয়ে দেব না।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১১(গ) ধারায় যৌতুকের জন্য সাধারণ বা মারাত্মক জখম এবং মৃত্যু ঘটানো বা ঘটানোর চেষ্টার শাস্তি বিধান করেছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা বলছেন, দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকারের আশায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার অধিকাংশ নারী এই ধারায় মামলা করেন।
স্বামী-স্ত্রীর মতের অমিল, পারিবারিক অশান্তি ও পরকীয়াসহ নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া বা বিবাহবিচ্ছেদ সমাজে একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনাও অহরহ ঘটতে থাকায় এ ধারায় মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
মা-বাবা আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিলেন সুখী (২৪)। কিন্তু সুখীর কপালে সুখ তো জোটেইনি, বরং শ্বশুরবাড়িতে বর্বর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বিয়ের ১২ বছরের মাথায় যৌতুক না পেয়ে স্বামী ও তার স্বজনেরা মিলে টেস্টার দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সুখীর ডান চোখটি একেবারে উপড়ে ফেলে। বাঁ চোখেও ছিল মারাত্মক আঘাত। ঘটনাটি ২০১৫ সালে সাভারের জিঞ্জিরার।
যৌতুকের কারণে অনেক নারীকেই হত্যার শিকার হতে হচ্ছে। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলেও অনেকে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২০১৬ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ৯ জন নারী আত্মহত্যা করেন। ২০১৫ সালে আত্মহত্যাকারী নারীর সংখ্যা ছিল ১৮। হিসাবটি বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যৌতুককে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালে ১৭৩ জন নারী খুন হয়েছেন। নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৬২টি। আর গত পাঁচ বছরে এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ১৫১ জন নারী। দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার যৌতুক। প্রতিরোধে প্রয়োজন আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ ও সামাজিক আন্দোলন।
n লেখক : গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
