সপ্তাহ না যেতেই উজানে গজলডোবা ব্যারাজের সবকটি কপাট খুলে দেওয়ায় তিস্তা আবারও ফুঁসে উঠেছে। পানি বাড়ছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। গতকাল সন্ধ্যায় লালমনিরহাটে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার এবং ডালিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে তিস্তার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি প্রবাহ অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়েছে। পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়ে পানির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পানি আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় অববাহিকার নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে, ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশ্বর ও পূর্ব ছাতনাই গ্রামসহ ছয়টি ইউনিয়নের ১০টি চর ও গ্রাম, লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, তুষভান্ডারের আমিনগঞ্জ, কাকিনা, পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান,গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর,ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেশকিছু মত্স্য খামারের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। দফায় দফায় পানি বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন রবিশস্য ও ফসলের ক্ষেতে পানি ঢুকে পড়ায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
এর আগে গত ৮ জুলাই রাত ১২টায় একই পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ১৫ ঘণ্টা পরেই কমে গিয়ে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। বৃহস্পতিবার রাতে আবারও উজানের প্রবল ঢল ও হালকা বৃস্টিতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আবারও ঐসব এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে তিস্তার পানি ব্যারাজ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল রাতে ঢলের পানি আসা কমে যাওয়ায় ব্যারেজ পয়েন্টে পানি কমতে শুরু করলেও ভাটিতে বাড়ছে তিস্তার পানি। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, তিস্তার বেডে পলি ও বালু জমে ভরাট হওয়ায় অল্প পানিতে নদী অববাহিকা প্লাবিত হয়ে থাকে। এতে চর ও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোতে তিস্তার পানি ঢুকে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উজানে পানির চাপ থাকায় তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেটের সবগুলো খোলা রাখা হয়েছে। উজান থেকে পানি এলেই তিস্তার পানি বেড়ে গিয়ে বিপত্সীমা অতিক্রম করে থাকে। কোনো বৃষ্টিপাত না থাকায় আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমাদের লালমনিরহাট সংবাদদাতা শফিকুল ইসলাম জানান, এসব এলাকায় চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আবার অনেক এলাকাতে হাঁটু পানি রয়েছে। উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো তাদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় কিংবা বাঁধের পলিথিন টানিয়ে দিন পার করছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এভাবে থাকায় এসব পরিবারে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এমনিতেই করোনা মহামারি, তার ওপর বন্যা। কাজ ও খাদ্যাভাবে পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বন্যাকবলিত নিম্ন আয়ের মানুষগুলো।
এদিকে যমুনার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার দক্ষিণাংশে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। এ অঞ্চলের ৫০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে অসংখ্য স্থাপনা। সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীতে অব্যাহত পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চৌহালীর খাসপুখুরিয়া থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটারে ভাঙন দেখা গেছে। গত দুই সপ্তাহে অর্ধশত বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার ও কয়েক শত একর জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, বিনানই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুম্ভুদিয়া পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, সুম্ভুদিয়া আজিজিয়া আলিম সিনিয়র মাদরাসা, সুম্ভুদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (চৌহালীর দায়িত্বে) সিরাজুল ইসলাম জানান, বিনানই এলাকায় ভাঙনরোধে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং চলছে।
