যে বিষয়টি বিবেচনা জরুরি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২১, ২২:২১

২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য শিক্ষা খাতে মোট ৭১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ০৮ ভাগ। এ সময়ে দেশের অন্যান্য খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য দরকার পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষা প্রসারের বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলো বরাবরই শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। বৃত্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। দুঃখজনক যে, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠগুলো গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এখনো সুনাম অর্জন করতে পারে নাই; যেখানে উন্নত দেশগুলো শুধু গবেষণার জন্য প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ইউনেস্কোর তথ্য মতে, শিক্ষা খাতে বাজেটে জিডিপির ন্যূনতম ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। কিন্তু এ পর্যন্ত শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২ দশমিক ৫ বা ৬ শতাংশের বেশি রাখা হয় না। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে চলতি অর্থবছরের তুলনায় জিডিপির হিসাবে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টাকার অঙ্কে এ খাতে বরাদ্দ ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা বাড়লেও জিডিপির হিসাবে তা কমেছে। এমন একটা দেশের উদাহরণ পাওয়া যাবে না, যারা জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে বরাদ্দ রেখে শিক্ষায় উন্নত হয়েছে। বিশ্বে ১২৫টার মতো দেশ আছে যারা শিক্ষা খাতে প্রতি বছর অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সেই তালিকায় নেপাল আছে। কিন্তু বাংলাদেশ নেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ২০১৯ সালে শিক্ষা খাতে ব্যয় করে জিডিপির ১.৩ শতাংশ যেখানে ভুটান করে ৬.৬ শতাংশ এবং নেপাল করে ৫.২ শতাংশ। বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে (নলেজ ইনডেক্স) বাংলাদেশের অবস্থান শোচনীয় পর্যায়ে। জ্ঞানসূচকে ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, ভারত ও পাকিস্তান  বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে। প্রাথমিক শিক্ষার দিক থেকেও আমাদের অবস্থান আরো নিচে। বাংলাদেশে মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস দেখা দেয় ২০০০ সালের মার্চ মাসে। তখন থেকে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস ঘরে বসে থেকে নির্জীব হয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় অনলাইনে পাঠদান। কিন্তু এই সুবিধা কত জন শিক্ষার্থী গ্রহণ করতে পেরেছে? একমাত্র শহরে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা এর সুফল ভোগ করতে পেরেছে। এই সুবিধা কি গ্রামে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে? মোটেই সম্ভব হয়নি। কারণ, যারা গ্রামে বাস করে তাদের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র শ্রেণির। তাদের না আছে স্মার্ট ফোন, না আছে ইন্টারনেট সুবিধা। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বেড়ে গেছে বৈষম্য। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য মতে, করোনার কারণে ২০০০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০.৯ শতাংশ যেখানে  নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ে ২০ মিলিয়ন লোক। মানুষের হাতে টাকা নেই। ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য সরকার ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ কর্মসূচি চালু করেছে। প্রথমে ৪ কোটি শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এ কর্মসূচি সফল করতে সরকার স্মার্ট ফোন কিনতে ৪১ হাজার ৫০১ জনকে ইতিমধ্যে ঋণ দিয়েছে। এ ঋণ কার্যক্রম চলমান থাকবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ফিচার ফোন আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। করোনার সময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বিদেশি ফিচার ফোনের মাধ্যমে উপভোগ করবে। সরকার ঋণ কার্যক্রম বহাল না রেখে বিদেশি স্মার্ট ফোন এই মুহূর্তে সহজলভ্য করে দিতে পারে। আরো দরকার ইন্টারনেট সুবিধার সম্প্রসারণ। তাই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ গতানুগতিক হওয়া ঠিক হয়নি। করোনা মহামারির সময় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের অর্থ অনলাইন ইনফ্রাস্টাকচার এর জন্য ব্যয় করা যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৮টি ব্যক্তি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত শত শত কলেজে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। এছাড়া আছে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমি মনে করি প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য কারিগরি শিক্ষা বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলো প্রথমদিকে  কারিগরি শিক্ষার প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল। সেন্টার ফর এডুকেশন এর তথ্যমতে, কারিগরি শিক্ষায় জার্মানিতে ৬৩ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০ শতাংশ, চীনে ৫৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত। সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করছে।

এদিকে স্বাস্থ্য খাতে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও জিডিপির তুলনায় তা এখনো ১ শতাংেশের নিচেই রয়ে গেছে। এখাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলানোর জন্য আরো বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। প্রথমদিকে করোনা সংক্রমণের হার বেড়েছে শুধু কয়েকটি শহরে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আছে শুধু সরকারি হাসপাতাল। বেসরকারি হাসপাতাল যেগুলো আছে তা মানসম্মত নয়। এ মুহূর্তে দেশব্যাপী আইসিইউ বেড এবং অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এছাড়া খুব দ্রুত ১৬ কোটির বেশি মানুষদের করোনা টিকা দিতে হবে। করোনা টিকা ক্রয়ে সরকারের অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে ক্রয় খরচ কমাতে পারলে ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক গড় হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান জিডিপির ১০ শতাংশ খরচ হয়। এর মধ্যে ব্যক্তির পকেট থেকে আসে ৩৫ শতাংশ আর সরকার দেয় ৫১ শতাংশ, বাকিটা অন্যান্য উত্স থেকে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১০ কোটি মানুষ চরম দরিদ্র হয়ে যায়। ব্যক্তির স্বাস্থ্যব্যয় কমার বদলে বেড়ে ২০১৭ সালে ৬৭ শতাংশে আর ২০১৯ সালে ৭২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে ২০১৭ সালে স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তির পকেট খরচ মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ, ভুটানে ২৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪২ শতাংশ, নেপালে ৪৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৬ শতাংশ আর ভারতে ৬২ শতাংশ অর্থাত্ বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আমাদের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ হওয়া উচিত। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। তাহলে করোনার বছরে কি স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ সন্তোষজনক বলা যায়? 

n লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক